জাতীয় সংহতি:  বাংলা নাটকের অর্জন ও বিসর্জন
ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫

জাতীয় সংহতির প্রশ্নটাকে আমরা কীভাবে ফিরে দেখতে পারি—এই বিষয়টা নিয়ে প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিলাম।  প্রস্তাবিত শিরোনাম — “জাতীয় সংহতি: বাংলা নাটকের অর্জন-বিসর্জন” — এর পানে দৃষ্টি রেখে শুরুতে আমার মনে হয়েছিল, “অর্জন-বিসর্জন” বলাটা যেন একটা কঠোর বাইনারি সৃষ্টি করে, যেখানে নাটককে ঐ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা খুবই সংকীর্ণ, প্রায় রক্ষণশীলতার  স্বরূপ। আসলে যেকোনো চিন্তাগত অবস্থানই নতুন অর্থ উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়—আমরা কোন ধারণাগত কাঠামো থেকে বিষয়টাকে দাঁড় করাচ্ছি। পরে ভাবলাম, “অর্জন-বিসর্জন”-এর মধ্যে একধরনের অলংকারময় দ্বন্দ্ব আছে—যেটা হয়তো কোনো তৃতীয় অর্থ বা নতুন ব্যাখ্যার ইঙ্গিতও দেয়। ভাষা তো এমনভাবেই কাজ করে। সেই বিবেচনায় আমি অবশেষে এই শিরোনামে সম্মতি জানাই।

এরপর মনে হলো, সংহতি বা ঐক্যের ধারণাটা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে কারণ সমসাময়িক নাট্যচর্চায় এই প্রশ্নটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নাটক রচনা, অভিনয় বা মঞ্চচর্চা—সর্বত্রই এখন এই প্রশ্নটা একধরনের বড় ঘটনা (phenomenon) হিসেবে হাজির। তাছাড়া, বাংলাদেশের নাটক নিয়ে কথা বলতে গেলেই দেখা যায়—বিশেষ করে এই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে—নাটকের নামকরণ, বিন্যাস কিংবা নান্দনিক প্রয়োগের মধ্যেও রাজনৈতিক অবস্থানের ছায়া আছে। অর্থাৎ, নান্দনিক চর্চা এখন রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে। বড় রাজনৈতিক ঘটনার পটভূমিতে জীবনযাপন মানেই—সাংস্কৃতিক কল্পনা ও শিল্পচর্চা রাজনীতির সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি করছে।

আমরা এখন যেই জটিল সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি—যেটাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন পর্যালোচনামূলক পর্যায় (ক্রিটিক্যাল জাংশন)। সেই প্রেক্ষিতে নাটককে আমরা কীভাবে দেখতে পারি? সাহিত্যের মানুষ হিসেবে বলতে পারি, আমরা যেন একধরনের “সন্ধ্যাবেলা” অতিক্রম করছি।  এই “সন্ধ্যাবেলার” ধারণাটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় সমাজবিজ্ঞানী ভিক্টর টার্নারের কথা—যিনি ড্রামা, থিয়েটার এবং পারফরমেন্স—এই  তিনটি ধারণাকে একসঙ্গে চিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। পাশ্চাত্য জ্ঞানের পরিসরে হলেও, তিনি পারফরমেন্সকে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারাডাইম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি—যেভাবে “নাট্য সাহিত্য” (dramatic literature)-কে একসময় কেবল পারফরমেন্সের নকশা (ব্লুপ্রিন্ট) হিসেবে দেখা হতো, আজ থিয়েটার সেই ধারণা থেকে সরে গিয়ে এক স্বতন্ত্র জ্ঞানের শাখা হয়ে উঠেছে। যেমন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের “নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ”-এর বাংলা নামের মধ্যেই সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত আছে—যেখানে “ড্রামা” থেকে “থিয়েটার”-এর দিকে অগ্রসর হওয়া মানে সাহিত্য থেকে সরে এসে এক জীবন্ত, শরীর-নির্ভর জ্ঞানের পরিসরে প্রবেশ করা।

এই থিয়েটার স্টাডিজের পরবর্তী বিকাশই হলো পারফরমেন্স স্টাডিজ, যা বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (যেমন Northwestern University) নাটককে কেবল সাহিত্যিক নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক ও শারীরিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছে। এরপর আমরা দেখতে পাই—শুধু আমেরিকাতেই নয়, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিসহ আরও বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পারফরম্যান্স স্টাডিজ একটি স্বতন্ত্র বিষয়/বিভাগ (ডিসিপ্লিন) হিসেবে গড়ে উঠেছে। এমনকি এই ধারানুকরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও--যেখানে আমি পড়াশোনা করেছি এবং এখন পড়াচ্ছি-- “Department of Theatre and Performance Studies” নামে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা সৃজনশীল অনুশীলনের পাশাপাশি বিভিন্ন পাবলিক ও সামাজিক ঘটনাকে প্রয়োজনীয় ক্রিটিক্যাল টুলস দিয়ে অধ্যয়ন করতে সচেষ্ট।

তবে, এ নিয়েও আমাদের ভেতরে অনেক আত্মসমালোচনা আছে—যা অনেক সময় আত্মশ্লাঘার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক (postcolonial) রাষ্ট্রে “Theatre and Performance Studies” নামটি ইংরেজিতে রাখা, অথচ এর কোনো বাংলা প্রতিশব্দ না থাকা—এই বিষয়টিই একধরনের সাংস্কৃতিক রাজনীতির ইঙ্গিত বহন করে। উত্তর-উপনিবেশিক কালচারাল লোকেশান নিয়ে আমাদের জ্ঞানগত দোদুল্যমানতা ইঙ্গিত করে। আমি যেসব কথা বলছি, সেগুলো তাই একধরনের কৈফিয়ত  হিসেবেও ধরা যেতে পারে—যার ভেতর দিয়ে আমার আলোচনার বিষয়ও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এখানে আমি ফিরে আসি ভিক্টর টার্নারের কথায়—যিনি সমাজকে বোঝার জন্য নাটক ও নাট্যশিল্প (বা dramaturgy)–এর ধারণা ব্যবহার করেছেন। তাঁর সঙ্গে রিচার্ড শেকনারসহ আরও কয়েকজন নৃতত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানী যুক্ত ছিলেন। তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, থিয়েটারে যেমন একজন জীবন্ত মানুষ(being)  “কিছু করে” (doing), তেমনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ একইভাবে “অভিনয়” করছে—একধরনের পারফরমেটিভ অস্তিত্ব প্রকাশের কাজে  অংশ নিচ্ছে। আমরা যখন কথা বলছি, তখনও আসলে একধরনের পারফরমেটিভ অবস্থা তৈরি হচ্ছে—একটি জীবন্ত মঞ্চ, যেখানে আমি বক্তার রূপে, আপনারা শ্রোতা হিসেবে। এটা বাস্তব হলেও, এর ভেতরে পারফরমেন্সের উপাদান আছে। একইভাবে, রাস্তার মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদ এসবও পারফরমেটিভ ক্রিয়া। মানুষ যখন কিছু করে, এবং সেই কাজের মধ্য দিয়ে চিহ্ন ও অর্থ উৎপন্ন হয়, তখনই সেটি পারফরমেন্স হয়ে ওঠে। এই সূত্রেই আমরা দেখি—নাটক যেখানে মূলত অভিনয়ের জন্য লিখিত চিত্রনাট্য বা নাটলিপি  (স্ক্রিপ্ট), থিয়েটার সেখানে সেই চিত্রনাট্যের (স্ক্রিপ্টের) জীবন্ত উপস্থাপন, আর পারফরমেন্স হলো সেই জীবন্ততার সামাজিক-রাজনৈতিক পরিসরসমেত একটি জটিল ক্রিয়াময়তার ধারণা ব্যক্ত করে। এই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হাজির করেন ভিক্টর টার্নার।

টার্নার বলেন, সমাজ নিজেই একধরনের নাটক—যেটিকে তিনি নাম দিয়েছেন সামাজিক নাটক (Social Drama)। সমাজের এই নাট্যরূপে আমরা দেখি—প্রথমে একটা ফাটল দেখা দেয়, যা সমাজের স্বাভাবিক অবস্থাকে ব্যাহত করে। উদাহরণস্বরূপ সাম্প্রতিক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট—ধরা যাক, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে। এই ঘটনাটি আমাদের জাতীয় জীবনে একটি ফাটল বা বিভাজন তৈরি করেছে—রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসিক স্তরে। টার্নার বলেন, প্রতিটি সমাজেই এই ধরনের ফাটল একসময় সংকটে রূপ নেয় (crisis)—একটা দ্বন্দ্ব তৈরি করে, যা নাটকের মতোই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। যেমন, ধ্রুপদী গ্রীক নাটক, এলিজাবেথীয় নাটক, কিংবা ফরাসি ধ্রুপদীবাদে (ক্লাসিসিজমে) নাট্যকার রাসিন, বা মলিয়ের প্রমুখের কাজেও  আমরা এই সংকট ভিত্তিক কাঠামোর প্রয়োগ দেখি। এমনকি আধুনিক ইউরোপীয় নাট্যকার ইবসেনের নাটকেও একই রকম দ্বন্দ্ব ও সংকটের (ক্রাইসিসের) বিন্যাস আছে। এই ইউরোপীয় কাঠামোর প্রভাব পড়েছে আমাদের অঞ্চলেও—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিসর্জন, রাজা ও রানী;  গিরিশচন্দ্র ঘোষ কিংবা মধুসূদনের নাটকেও আমরা সেই নাট্য কাঠামো খুঁজে পাই। টার্নার এখানে ইঙ্গিত দেন যে, এই ফাটল সমাজে একটি “সংকট” (crisis) তৈরি করে, সময়ের পরিক্রমায় তা তীব্র হয় এবং অবশেষে পৌঁছে যায় শুদ্ধিসাধন বা প্রতিকারমূলক কর্মের দিকে (redressive action)। অর্থাৎ, সমাজ তখন সেই সংকটের প্রতিকার বা পুনর্গঠনের পথ খোঁজে। যেভাবে নাটকে সংকটের পর সমাধান, মিলন, বা নতুন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে—তেমনি সমাজও তার সংকটের পরে কোনো না কোনো প্রতিকারমূলক (redressive)  অবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। 

ভিক্টর টার্নারের সামাজিক নাটকের (social drama) কাঠামোতে আমরা দেখেছি—একটা সমাজের  ফাটলাবস্থা সংকটে রূপ নেয়, তারপর আসে সংকটের প্রতিকার সাধনের চেষ্টা। কিন্তু আমাদের সমাজে—বিশেষ করে,  সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতায়—রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বা ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে প্রতিকার সাধনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং মানুষ নিজেরাই রাস্তায় নেমে এসেছে, এবং তারা যা করার সেটাই করেছে—একটি অপ্রত্যাশিত ব্যবস্থাকে উৎখাত করেছে। এই ঘটনাটিকে আমরা একধরনের সামাজিক নাট্য হিসেবে পড়তে পারি। শেকসপিয়ার বা গ্রীক নাট্যরীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও এর কাঠামো একেবারে নাটকীয়—ফাটল, সংকট, প্রতিকার, তারপর পুনর্গঠন বা reintegration

টার্নারের মতে, সমাজের নাট্যে সংকটের পরে সাধারণত আসে পুনঃসংহতি (reintegration)—একটি আশাবাদী পরিণতি, যেখানে দুঃখের অবসান ঘটে, সমাজ আবার একত্রিত হয়। কিন্তু সবসময় তা হয় না, কখনো কখনো সেই সংকটই নতুন ফাটলের বা schism সূচনা করে। আমাদের বর্তমান সময়কেও তাই আমরা এক ধরনের সংকট-পরবর্তী (post-crisis)  মুহূর্ত হিসেবে দেখতে পারি—যেখানে আমরা একসময় পুনঃসংহতির আশা করেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে দেখছি, নতুন এক বিভাজন, নতুন এক স্কিজমের দিকে সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। তবু মানুষ হিসেবে, নাগরিক হিসেবে, আমাদের ভিতরে সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই যায়—আমরা কি আবার মিলতে পারব? আমাদের দুঃখ, দুর্দশা, সংকট আর ফাটলগুলো অতিক্রম করে কি আমরা আবার একটি সম্মিলিত সত্তা হিসেবে দাঁড়াতে পারব? আমরা কি আবার একে অপরের দিকে ফিরে যেতে পারব?

এই আকাঙ্ক্ষাটাই আসলে নাটকের প্রাণ। নাটকে যেমন দ্বন্দ্বের পরিণতিতে আসে মিলন, তেমনি বাস্তব জীবনের মধ্যেও আমাদের কামনা পুনর্মিলনের। এখানেই নাটক ও সমাজ একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। সমাজকে নাটকের রূপে পড়া যায়, আবার নাটককেও সমাজের অভিজ্ঞতার আলোয় ব্যাখ্যা করা যায়। এই জায়গাটাতেই থিয়েটার, বিশেষ করে আমাদের বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস—একে শুধু নান্দনিক বা সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সমাজবিজ্ঞান, নৃতাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পড়া দরকার। কারণ, নাটক শুধু শিল্প নয়, এটি সমাজে সংহতি নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। আমাদের “আধুনিক” বাংলা নাটকের সূচনাও ঔপনিবেশিক সময়ে—যেখানে নাট্যচর্চা ছিল একধরনের আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই, আত্মপরিচয়ের সন্ধান। তাই এই ইতিহাসকেও আমরা জাতীয় সংহতি র একটি ধারণাগত কাঠামো (ফ্রেমওয়ার্ক) দিয়ে পড়তে পারি। এই কারণেই আমি ভেবেছি, আমার আলোচনাটা এভাবেই শুরু করা যায়—যাতে বোঝানো যায়, সংহতি বা ঐক্যের প্রশ্নের সঙ্গে থিয়েটারের সম্পর্ক কীভাবে যুক্ত।

একটা ছোট উদাহরণের মাধ্যমে সংহতির ধারণাটা আরও সুস্পষ্ট হতে পারে। আমার হাতে একটি লেখা আছে—“Theatre And National Integration: The Example Of Niyi Osundare's The State Visit”—আফ্রিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক  Uwatt B. Effiok কর্তৃক রচিত। তিনি নাইজেরিয়ার আবুজা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার আর্টসের শিক্ষক। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, আফ্রিকার অভিজ্ঞতায় থিয়েটার কীভাবে জাতীয় ঐক্য, সংহতির ধারণার সঙ্গে মিশে গেছে, কীভাবে শিল্প সামাজিক সত্ত্বার পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখছে। আমি মনে করি, এই উদাহরণটি আমাদের আলোচনার জন্য একধরনের গৌরচন্দ্রিকা  কারণ এর মধ্য দিয়ে আমরা একদিকে সংহতির ধারণাকে, অন্য দিকে থিয়েটার কীভাবে সেই সংহতির বাস্তব রূপায়ণ করে, তা বুঝতে পারব। সেই জায়গাটাতেই তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন—“জাতীয় সংহতি কোনো আবেগের বিষয় না, এটা কোনো সেন্টিমেন্টাল বা নৈতিক আহ্বানও না, বরং এটা একটা সচেতন প্রক্রিয়া।  তার মতে, এটা আসে “জাতি-রাষ্ট্রের সামষ্টিক অস্তিত্ব বজায় রাখতে একটি সচেতন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি (a conscious social, political and economic policy maintaining the corporate existence of the nation-state)” হতে । অর্থাৎ একটা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে, তাকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে যে সমাজ, রাজনীতি আর অর্থনীতির মধ্যে দিয়ে পরিকল্পনা তৈরি হয়, সেটার সঙ্গে এই সংহতি সংযুক্ত। জাতীয় সংহতির সঙ্গে একটা চেতনার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই চেতনা মানে আমরা যেভাবে “চৈতন্য” শব্দটাকে ব্যবহার করি — কোনো মানসিক বা নৈতিক জাগরণের অর্থে — তা না। এখানে চেতনা মানে হচ্ছে সচেতনতা। সমাজ, রাজনীতি এবং অর্থনীতি সম্পর্কে একটা গভীর সচেতন অবস্থান এবং এই সচেতনতার ভিত্তিতেই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিকে নতুন করে নির্মাণ বা পুনর্গঠনের যে নীতিনির্ধারণ হয়, সেই নীতিই জাতীয় সংহতির ভিত তৈরি করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, এটা কেবল কোনো একক নৈতিক আহ্বান না — এটা একদম পরিকল্পনামূলক একটা রাষ্ট্রচিন্তা, যেখানে ঐক্য, সহযোগিতা, পারস্পরিক আস্থা— এই তিনটি জিনিস অপরিহার্য।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই সহযোগিতার (cooperation) উৎস কী? সেটা আসবে তখনই, যখন রাষ্ট্রের এই সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, বর্ণ, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী— সবার অংশগ্রহণ, সবার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সবার অধিকার প্রতিফলিত হবে। কারণ একটা জাতি তো কখনোই সমজাতীয় (homogeneous) নয়। বাংলাদেশের কথাই ধরুন— আমরা হয়তো বলি বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান, কিন্তু বাকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ১০ শতাংশেরও তো অস্তিত্ব আছে। এই রাষ্ট্রের ভেতরে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও, এর বাইরেও আছে ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠী, আছে নানান ধর্মীয় সম্প্রদায়, আছে বিভিন্ন ভাষাভাষী, বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ, এবং আজকের সমাজে তো লিঙ্গ পরিচয়ও একরৈখিক নয়। অর্থাৎ, জাতি মানেই এক ধরনের বৈচিত্র্য। তাই জাতীয় সংহতি মানে এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করা। আর এখানে অ্যান্ডারসনের “imagined political community”-র কথাটাও প্রাসঙ্গিক— জাতি আসলে একটা কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়, যেটা একরৈখিক নয়, বরং নানা অসমসত্তার উপাদান নিয়ে তৈরি। এই অসমসত্তার মানুষগুলোর ভিন্ন অভিজ্ঞতা, ভিন্ন শ্রেণি, ভিন্ন মতাদর্শ, ধর্ম বা সংস্কৃতি ইত্যাদির মধ্যে যদি একটা সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, যদি তারা সবাই রাষ্ট্রের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অপরিহার্য অংশ হয়, তবে সেই সম্মিলিত প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই আসে জাতীয় সংহতি। অর্থাৎ, জাতীয় সংহতি মানে হলো রাষ্ট্রের অন্তর্গত নানান পার্থক্যকে অস্বীকার না করে, বরং সেই পার্থক্যের মধ্যেই একটা ঐক্য ও সহযোগিতার জায়গা তৈরি করা— এটাই চূড়ান্ত অর্থে সংহতি । এর মানে হচ্ছে, একটি জাতির নীতি প্রণয়ন — সেটা কেবল প্রশাসনিক বা কারিগরি ব্যাপার নয় — বরং তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের আত্মনির্মাণের প্রচেষ্টা। একটি জাতি যখন নিজের নীতি, নিজের অর্থনৈতিক কাঠামো, নিজের রাজনৈতিক রূপরেখা তৈরি করে, তখন সে তার জীবনের  অর্থাৎ তার সামষ্টিক জীবনের ভবিষ্যত রূপরেখা নির্ধারণ করে। সে ভবিষ্যতের দিকে কীভাবে তাকাতে চায়, নিজের ভাগ্যকে কীভাবে গঠন করতে চায়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই জাতীয় সংহতি বিষয়টাকে বোঝা যায়। এটা একটা দিক।

দ্বিতীয়ত, এই নীতি প্রণয়নের জায়গাটাই অনেক সময় বিকৃত হয়ে যায়। যেমন, সেই নাইজেরীয় গবেষক বলছেন, আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে দেখা যায় যে, অনেক রাষ্ট্র জাতীয় সংহতি অর্জন করতে পারে না কারণ তাদের জাতীয় নেতৃত্বই হয়ে পড়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। তিনি বলছেন, আফ্রিকার বহু "রাষ্ট্রে জাতীয় নেতারা নিজেরাই অবৈধ সম্পদ আহরণ, লুটপাট ও দুর্নীতিতে নিমগ্ন” (the national leaders are themselves involved in illegal extraction, plundering, and corruption) । রাষ্ট্রের নেতারাই যখন অবৈধ লুন্ঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তখন তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটা হয়ে যায় জনবিরোধী। ফলে সেখানে জাতীয় সংহতি গড়ে ওঠে না, বরং তৈরি হয় গভীর এক হতাশা—এক ধরনের সামষ্টিক অসন্তোষ। এই হতাশা শুধু রাজনৈতিক না, সাংস্কৃতিকও। একটা জাতি তখন নিজের সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ, নিজের সৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকে। জাতির সাংস্কৃতিক বিকাশ, তার আত্মিক পরিপূর্ণতা, তার যে সম্ভাব্য সংহতি— সবকিছুই তখন জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়ে, পরাজিত হয় এবং এই পরাজয় শুধু রাষ্ট্রের নয়, ব্যক্তিরও।

এটা যেমন সামষ্টিক, তেমনই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা— কারণ নাগরিকও তখন নিজের ভিতরে সেই সম্মিলিত সত্তার শক্তির উপস্থিতি খুঁজে পায় না । এখন আমার প্রশ্নটা এখানেই— এই যে আফ্রিকার বাস্তবতা, এটা কি বাংলাদেশ থেকে খুব আলাদা? আমাদের বাস্তবতায়ও আমরা দেখি একই ধরনের সংকট— রাষ্ট্রের নেতৃত্বের অবক্ষয়, জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি, দুর্নীতি, ক্ষমতার লোভ, আর সেই সঙ্গে নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান হতাশা। তাহলে এই তুলনাটা অকারণ নয়। আমরা কোনো ছোট গুহার মধ্যে নেই, আমরা এক বৃহত্তর পৃথিবীর অংশ। তাই আমাদেরও উচিত নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে পৃথিবীর অন্যান্য সমাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে পড়া। কারণ, অন্যরা যেমন তাদের ইতিহাসকে ফিরে দেখে, তাদের সংস্কৃতির অভিব্যক্তিগুলোকে পুনরায় ভাবতে চায়, সংলাপ তৈরি করে— সেখান থেকে আমরাও শিখতে পারি, আমরাও আমাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে পারি।

এই জায়গা থেকেই আসে আমার পরের যুক্তি (পয়েন্টটা)। যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতীয় সংহতি গঠনে ব্যর্থ হয়, তখন কী হয়? তখন দায়িত্বটা চলে আসে অন্যান্য কুশিলবদের হাতে — যেমন শিক্ষক, শিল্পী, লেখক, নাট্যকর্মী, সংগঠক, সমালোচক — অর্থাৎ, যারা সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে নেই, কিন্তু জাতির সাংস্কৃতিক চেতনা নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এই গোষ্ঠীর অংশ — কেউ নাট্যসৃজনে, কেউ সাহিত্যে, কেউ গবেষণায়, কেউ বা কেবল সেই সাংস্কৃতিক রস গ্রহণে। আমরা মূলত সেই বিকল্প শ্রেণির অংশ, যারা রাজনীতিবিদদের বাইরে থেকেও এক অর্থে জাতির বিবেককে জাগিয়ে রাখে। এই কথাগুলো হয়তো শুনতে কিছুটা “বস্তাপচা” বা পুরনো ধরনের নৈতিক বাক্য মনে হতে পারে, কিন্তু সংকটের সময় নৈতিকতাকে পুনরুদ্ধার করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।

জাতীয় চেতনা বুঝতে চাইলে, আমাদের ফিরে যেতে হয় শিল্পে, সাহিত্যে, নাটকে। কারণ সেখানেই থাকে মানুষের আত্মবীক্ষণ, সেখানেই থাকে সমাজের সত্যিকারের প্রতিফলন। আর সেই কারণেই আমি বলব, থিয়েটার বা নাটক শুধু শিল্প নয়, এটি একটি ভাবাদর্শিক সংগ্রামের জায়গা। অ্যারিস্টটলের কথাটা আমরা সবাই জানি—মানুষ বস্তুত রাজনৈতিক জীব বা political animal। অর্থাৎ, মানুষ রাজনীতির মধ্য দিয়েই নিজের অস্তিত্ব গড়ে তোলে। মানুষের সব কাজই রাজনৈতিক হলে থিয়েটারও অবশ্যম্ভাবীভাবে রাজনৈতিক। নাটক কোনো নিরপেক্ষ শিল্পকলা নয়— বরং মানুষের রাজনৈতিক অস্তিত্ব, তার সামাজিক আত্মসন্ধান এবং তার সংহতির আকাঙ্ক্ষা সবকিছুরই এক গভীর প্রকাশ।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ঐতিহাসিকভাবে দেশে দেশে থিয়েটার বা নাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যমই নয়; বরং এটা একটা ভাবাদর্শী সংগ্রামের ধারালো হাতিয়ারও হয়ে উঠেছে। অনেক সময় কোনো নাটককে আমরা বাহ্যিকভাবে "বিষয়ভিত্তিক নয়", "শুধু বিনোদন" বলেই নেব — কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই যে অদৃশ্যমান পথে রাজনৈতিক বা ভাবাদর্শিক অর্থ প্রবাহিত হয়, সেটাই আসলে আমাদের কাজ—সেটিকে ধরতে হবে ও পাঠ করতে হবে। থিয়েটারে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে সামাজিক যৌথ অভিজ্ঞতা এবং একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নির্ণয়  (ইন্ডিভিজুয়াল সেলফ-ডিটারমিনেশন)। অর্থাৎ, কোনো সম্প্রদায়ের যৌথ ও ব্যক্তিগত পরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হয়—এই প্রশ্ন থিয়েটারে সবচেয়ে প্রখরভাবে আসে। অন্য শিল্পেও এটা আসে, কিন্তু থিয়েটারের ইমিডিয়েটনেস বা তাৎক্ষণিকতার কারণে এই অনুভূতিটা বেশি তীব্র হয় এবং সেই তাৎক্ষণিকতাই থিয়েটারকে করে তোলে ক্ষণস্থায়ী। অর্থাৎ একধরনের ক্ষণস্থায়ী শিল্পরূপ (এফিমেরাল আর্ট ফর্ম)। একটি নির্দিষ্ট রজনী, নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট, নির্দিষ্ট সময়—সব মিলিয়ে একটি মুহূর্ত তৈরি হয়; সেই মুহূর্তটি একবার ঘটে, শেষবারের মতন চলে যায় যা আর আর কখনো  ফিরবে না—সেই "প্রথমবার" ও "শেষবার"–এর সংমিশ্রণই থিয়েটারের জাদু। এজন্য নাট্যকারেরা সবসময় তাৎক্ষণিত অভিজ্ঞতা (ইমিডিয়েট এক্সপেরিয়েন্স) ধরার চেষ্টা করেছেন। মানব-অবস্থার তাৎক্ষণিক বাস্তবতা, আশাহীনতা, আকাঙক্ষা, সংকট—এসবই নাটকে সুস্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে। এই তাৎক্ষণিকতাই চিরকালীনতার শর্ত তৈরি করে। এই কারণে থিয়েটারের ধ্রুপদী (ক্লাসিকাল) কাজগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ঊনিশ শতকের নাটকগুলোতে দেখা যায় মানব পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতাকে কীভাবে রূপায়িত করা হয়েছে। থিয়েটার শুধু একটি ফর্ম নয়; এটা এক ধরনের আধ্যাত্মিক (স্পিরিচুয়াল), সামাজিক অনুশীলনও যেখানে আচরণ, ভঙ্গিমা, চলন বুলি ইত্যাদি এক নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে যুথবদ্ধ রূপে একটি তীব্র বাস্তবতার প্রতিরূপ নির্মাণ করে।

আর এই তীব্রতা থেকেই আসে থিয়েটারের রাজনৈতিক শক্তি। যখন রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়, জাতীয় সংহতি অক্ষম হয়, তখন থিয়েটার তার একটি বিকল্প পথ দেখাতে পারে। থিয়েটার কাজ করে মানুষের চেতনা বদলাতে, মানব চৈতন্যে আঘাত করে, প্রশ্ন তোলে, সংলাপ শুরু করে। সরাসরি ক্ষমতার জায়গায় না থেকেও নাট্যচর্চা জনসমাজে নৈতিকতা, সমালোচনা, ও সমবেত চেতনা জাগিয়ে দিতে পারে। অন্য কথায়, যদি রাজনীতির ব্যর্থতাই সামাজিক ফাটল তৈরি করে, তাহলে থিয়েটার সেই ফাটলকে দৃশ্যমান করে, জিজ্ঞাসা করে, এবং কখনো কখনো পথও দেখায়। থিয়েটারে থাকা তাৎক্ষণিকতা ও গোষ্ঠীগত অভিজ্ঞতা (কমিউনাল এক্সপেরিয়েন্স) মানুষকে সরাসরি প্রভাবিত করে এবং সেই প্রভাবই সমাজ পরিবর্তনের সূচনাবিন্দু হতে পারে।

কারণ পরিবর্তনের নিয়ামক মানুষ নিজেই। ফলে মানুষকে, তার ভিন্নতাসহ, এমন এক জায়গায় পৌঁছতে হয় যেখানে সে ভবিষ্যতের জীবনের নকশা বা design of living নিজেই আঁকে। থিয়েটার সেই অর্থে একটি স্কেচবোর্ডের মতো, যেখানে বাচনের এবং যাপনের নকশা তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই একটি জনগোষ্ঠী তার সমস্ত বৈচিত্র্য—ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, জাতি, শ্রেণি—নিয়ে কীভাবে থিয়েটারের ভেতর দিয়ে তাদের বাচনের নকশা তৈরি করেছে এবং সেই নকশার মাধ্যমে জাতীয় সংহতি কতটা দৃঢ় বা ফাটলপূর্ণ ছিল। আমার মূল প্রস্তাবটি হচ্ছে, বর্তমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা প্রধান সামাজিক দ্বন্দ্ব বোঝার জন্য আমাদের ঊনবিংশ শতকে ফিরে তাকাতে হবে। সেই সময়েই প্রথম উত্থাপিত হয়েছে জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্নগুলো: আমরা কি ভাষাভিত্তিক জাতি, ধর্মভিত্তিক জাতি, শ্রেণিভিত্তিক রাষ্ট্র, নাকি এমন একটি নৈতিক রাষ্ট্র চাই যেখানে বৈচিত্র্যের মধ্যেও আমরা এক হতে পারি। এই “এক হওয়া”  প্রশ্নই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্কটের কেন্দ্র। এই সঙ্কটের উত্থান এবং তার সম্ভাব্য সমাধানের ইঙ্গিত আমরা ঊনবিংশ শতকের বাংলা নাটক থেকে পাই। সেই সময়ের কিছু নাট্যঘটনা দেখলে বোঝা যায় যে কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ইতিহাসপর্বের মানুষ তাদের চিন্তা, সংকট এবং আশা নাটকের ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

তবে প্রথমে প্রশ্ন আসে—বাংলা নাটক বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? আমার লেখায় বলেছি, “সাহেব-বাবুর বৈঠকখানায় উনিশ শতকের কলকাতায় সূচিত বাংলা নাট্যের ঐতিহাসিক ভ্রান্তিবিলাস।” সেখানে বলতে চেয়েছি যে,  আধুনিক বাংলা নাটকের আবির্ভাব মূলত সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের ফল। ব্রিটিশ উপনিবেশিক আধিপত্য শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও আধুনিকতার ধারণা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই আধুনিকতার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় শ্রেণিগত বিভাজন। ভদ্রলোক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, এবং সেই শ্রেণি থেকেই সাহেব-বাবুর নাট্যচর্চা শুরু হয়। ফলে আধুনিক বাংলা নাট্যচর্চা এবং  গ্রামীণ বা দেশজ নাট্যের মধ্যে একটি গভীর বিচ্ছেদ তৈরি হয়। যেখানে বাংলায় শতাধিক আঙ্গিকের লোকনাট্য প্রচলিত ছিল—আলকাপ, যাত্রা, গাজীর গান, পুতুলনাচ, পালাগান, শিব-মনসা-নাথ-বৌদ্ধ এবং সুফি ও মারফতি ধারার নানান নাট্য—সেই সমৃদ্ধ ধারার সঙ্গে আধুনিক শহুরে নাটকের এক জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছেদ ঘটে। এই বিচ্ছেদ, শ্রেণিগত রূপান্তর এবং নতুন শহুরে সাংস্কৃতিক ক্ষমতা কাঠামো ঊনবিংশ শতকের বাংলা নাটকের মূল প্রসঙ্গ। এখান থেকেই শুরু হয় জাতীয় সত্তা, সংহতি, এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিতর্ক।

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলা নাটক বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি ইতিহাসতাত্ত্বিক (হিস্টরিওগ্রাফিক) সমস্যা। বাংলা নাট্যের ইতিহাস প্রায়শই ধর্মভিত্তিক বিভাজনের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয়েছে—বাঙালি মুসলমান এবং বাঙালি হিন্দুর বিভাজনকে কেন্দ্র করে। ফলে ইতিহাস রচনার ধরনে পক্ষপাত (বায়াস) রয়েছে। আমরা যদি অন্য দিক থেকে দেখার চেষ্টা করি, তাহলে বুঝতে পারি যে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলা নাট্যের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে।

আঠারো শতকের সমাপনান্তে ২৭ নভেম্বর ১৭৯৫ সালে কলকাতায় ডোমতলায় (বর্তমান এজরা স্ট্রিট) একটি বাঙালি থিয়েটারের সূচনা ঘটে বলে প্রচলিত ধারণা আছে। সেখানে একজন রুশ যুবক ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায় নাটক রূপান্তর করেন। এই ঘটনাকে প্রায়শই বাংলা নাট্যের “সূচনা” হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—নাটক বলতে আমরা আসলে কী বোঝাচ্ছি? ইউরোপীয় চিন্তাধারায় যেমন অ্যারিস্টটলীয় বা হেগেলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নাটককে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, সেই সংজ্ঞাই এখানে আরোপ করা হয়েছে। সংলাপ, চরিত্র, প্লট বা গল্পের বিন্যাস—সবকিছু পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে। এর ফলে বাংলা ঔপনিবেশিক নাট্যে একটি নতুন নন্দন ভাষার জন্ম হয়। জার্মান দার্শনিক শিলার বলেছেন, নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস সবসময় নতুন নান্দনিক বিন্যাসের জন্ম দেয়। এভাবে ঔপনিবেশিক যুগে আধুনিক বা নতুন ধরনের নাট্যচর্চা শুরু হয়। এর আগে বাংলায় কথানাট্য, নাটগীত, পাঁচালি আঙ্গিকের বহুবিধ নাট্য প্রচলিত ছিল। দেশজ নাট্যের ধারায় সাধারণত একজন কথক একই সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে (সাবজেক্টিভভাবে) বয়ান করত এবং নৈর্ব্যক্তিকভাবে (অবজেক্টিভভাবে) চরিত্রায়ন করত; নাচ, সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে গল্প উপস্থাপিত হতো। হাজার বছরের দেশজ ঐতিহ্য এবং প্রাচীন ভারতীয় (দক্ষিণ এশিয়) সাংস্কৃতিক ধারার মধ্য দিয়ে নাটকের চর্চা প্রচলিত থাকলেও ১৭৯৫-এর পর ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি সাংস্কৃতিক পরিসরে আধিপত্য বিস্তার করে। ইউরোপীয়/ইংরেজ শাসকদের দ্বারা নাটকের সূত্রপাতকে “সৃজনের শুরু” হিসেবে ধরা হয়। এতে স্থানীয় সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও অভিব্যক্তি মুছে ফেলার ইতিহাসতত্ত্বের শিকার হয়ে অধিপতিশীল আধুনিক অঙ্গন থেকে প্রায় হারিয়ে যায়। তবুও, বাবু ও ভদ্রলোক শ্রেণির থিয়েটার বা ইংরেজ-ইউরোপীয় অনুকরণের মধ্যেও নতুন সৃজন-সম্ভাবনা জন্ম নেয়। এই সম্ভাবনার মধ্যেই দেখা দেয় জাতীয় সংহতি এবং সামস্টিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। কলকাতাকেন্দ্রিক এই নাট্যচর্চা আমাদের দেখায় যে, নতুন ধরনের নাট্যভাষার উদ্ভব এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক, সামাজিক, এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে সংহতির প্রশ্ন কতটা জটিলভাবে গড়ে ওঠে।

ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ববঙ্গের নাট্যচর্চা অধিপতিশীল ইতিহাসে স্থান পায়নি। এটি একটি ইতিহাসতাত্ত্বিক (হিস্টরিওগ্রাফিক) সমস্যা হিসেবেই এখনো রয়ে গেছে। এই সমস্যার কারণে, আমরা আজও ঢাকাকেন্দ্রিক বা পূর্ববঙ্গের নাট্যচর্চার সম্পূর্ণ চিত্র পাইনি। যদিও কিছু লিটারেচার পাওয়া যায়, তবে তা সীমিত। ফলে, আমরা বলতে পারি, ঔপনিবেশিক শাসন এবং সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের প্রভাবে যে ধরনের নাটকের ধারা গড়ে উঠেছিল, তা পুরোপুরি ইউরোপীয় অনুকরণ-নির্ভর। কিন্তু সেই অনুকরণের মধ্য দিয়ে আত্মিকরনের নতুন সৃজন-সম্ভাবনা জন্ম নিয়েছে। যেমন দীনবন্ধু মিত্রের কাজ। তাঁর প্রকৃত নাম গন্ধর্বনারায়ণ। ১৮৬০ সালে তিনি লিখেন নীলদর্পণ। নীলদর্পণ নিয়ে সাবল্টার্ন স্টাডিজের পাইয়নিয়ার ইতিহাসবিদ রণজিত গুহের লেখা বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। বলা হয়, ঢাকায় এই নাটক সর্বপ্রথম প্রদর্শিত হয়, এটি পূর্ববঙ্গ নাট্য সমাজ কর্তৃক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন এলাকায় প্রদর্শিত হয়। এই তথ্যও একটি ইতিহাসতাত্ত্বিক (হিস্টরিওগ্রাফিক) বিতর্কের জন্ম দেয়। যাই হোক, কাঠামোগত দিক থেকে দেখা যায়, দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ  সম্পূর্ণ ইউরোপীয় নাট্যনন্দন-কাঠামো অনুসরণে লেখা—পঞ্চাঙ্ক বিশিষ্ট এবং দ্বন্দ্বভিত্তিক। এটি পাশ্চাত্য নাট্য-নন্দনের খোলস গ্রহণ করেছে, কিন্তু ভিতরে স্থানীয় প্রতিরোধের গল্প উপস্থাপন করেছে। অর্থাৎ, দীনবন্ধু মিত্র ইউরোপীয় নাট্যরীতিকে আত্মীকরণ করেছেন, শাসকগোষ্ঠীর নাট্য-কাঠামো গ্রহণ করেছেন, আবার অভ্যন্তরীণভাবে সেই ধারা ব্যবহার করে শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতা করেছেন। ফলে এখানে একটি অসাধারণ দ্বৈততা দেখা যায়।

এই দ্বৈততা দেখায়, একদিকে নিজের জাতি ও জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা, আবার একই সঙ্গে নান্দনিক দিক থেকে কিছুটা বশীভূত হয়ে থাকা এবং আনুগত্য স্বীকার করা। ফলে আমরা বাইনারিজম কখনো পুরোপুরি দেখব না—বহিরাবরণে আনুগত্য, ভেতরে প্রতিরোধের আগুন প্রজ্জ্বলিত। এই ধরনের উদাহরণ দীনবন্ধু মিত্রের নাটকে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। অন্যদিকে, জামিল আহমেদ উল্লেখ করেছেন, নীলদর্পণ-এর পর বৃহৎ সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে ধরতে সক্ষম নাটকের উদাহরণ পেতে হলে ১৯৪৪ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বিজন ভট্টাচার্যেরনবান্ন নাটকের উদাহরণ দেন। উনিশ শতকের কলকাতায় সাধারণ রঙ্গালয় এবং বিশেষত, ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের ঘটনায় দেখা যায় ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব অর্থাৎ একটি কালচারাল টেনশন। শুধুমাত্র ইংরেজদের অনুকরণ করলেই তাদের নাট্যচর্চা যথেষ্ট হয় না, নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের জন্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য নাটক করা শুরু হয়। ন্যাশনাল থিয়েটারে নারীদের অভিনয়ও নতুন মাত্রা যোগ করে। চারজন নারী—জগত্তারিণী, গোলাপ, এলোকেশি, শ্যামা—নাট্যমঞ্চে আসার মধ্য দিয়ে লিঙ্গভিত্তিক পরিচয় থেকে জাতীয় সংহতি ও জাতি নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়। অন্যদিকে, নাট্য পরিবেশনা (ড্রামাটিক পারফরম্যান্সগুলো) তখন রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হতো। রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে বা প্রতিরোধ করতে এমন নাটকগুলো অনেক তৈরি হচ্ছিল। উদাহরণস্বরূপ, গজদানন্দ যুবরাজ নাটক। ১৮৭৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের প্রিন্স অফ ওয়েলস এডওয়ার্ড ভারত ভ্রমণে  আসেন। তৎকালীন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের মেম্বার বাবু জগদানন্দ মুখার্জি তার বাড়িতে যুবরাজকে আমন্ত্রণ জানান, পুরুষ-নারীরা তাকে বরণ করেন। জগদানন্দের এই বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে উপেন্দ্রনাথ দাস রচনা করেন নাটক  গজানন্দ যুবরাজ । নাটকটি ঔপনিবেশিক আগ্রাসন এবং স্থানীয়  সম্পর্কের সীমা টেনে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় লিপ্ত হয়। এই নাট্যচর্চার দিকে দৃষ্টি আরোপ করলে দেখা যাবে নীলবিদ্রোহের বিরুদ্ধে নাটক বা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সচেতন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ শাসকগোষ্ঠীকে এমনভাবে বিচলিত করে তুলেছিল যার ফলে দমনমূলক ড্রামাটিক পারফরমেন্স অ্যাক্ট ১৮৭৬ প্রবর্তন করেছিল । ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী নেটিভদের সাংস্কৃতিক কাজে “বৈধভাবে” বল প্রয়োগ করতে নিপীড়নমূলক আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিল।

অন্যদিকে, বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশী আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ এবং “বাঙালি মুসলমান”  প্রভৃতি প্রসঙ্গের সূত্রে ঐতিহাসিক ধারার বাংলা নাটকের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে,ঊনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিক বাংলা নাটকের ধারা সাংস্কৃতিক উপনিবেশনের সূত্রে সূচিত হলেও মুসলমান সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল না। এর মানে কি মুসলমানদের কোনো সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল না? কলকাতার আধুনিক বাংলা নাট্যচর্চার বাইরে পূর্ববঙ্গের প্রসঙ্গে দেখা যায় বিপুল সংখ্যক দেশজ এবং ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা ও সাহিত্য ছিল, যা শ্রুতি ও স্মৃতির মাধ্যমে অভিনীত (পারফর্ম) হতো। সেখানে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল। তবে শহুরে আধুনিক (আরবান মডার্ন) এবং সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের (কলোনাইজেশনের) সরাসরি প্রভাবের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নাট্যধারায় মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়নি। তবে পূর্ববঙ্গের উদাহরণ আলাদা। মীর মশাররফ হোসেন জমিদার দর্পণ  লিখেছেন, যেখানে ১৮৭২–৭৩ সালের সিরাজগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহের পটভূমি ফুটে উঠেছে। নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো—প্রোটাগনিস্ট, এন্টাগনিস্ট, নারী, কৃষক, সাধারণ মানুষ—সকলেই এই সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।

এখানে দেখা যায় যে, মীর মশাররফ হোসেনের নান্দনিক বা নাটকীয় হস্তক্ষেপ (এস্থেটিক বা থিয়েট্রিক্যাল ইন্টারভেনশন) একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অন্যদিকে গিরীশ ঘোষ ও ডিএল রায়ের নাটকের মধ্যেও মুসলিম জীবন উপজীব্য হয়ে উঠেছে। এটি দেখায় যে,  বাঙালি বাবু বা ভদ্রলোক শ্রেণীর শিল্পচর্চায় মুসলমানেরা একেবারেই এক্সক্লুডেড ছিল না। গিরিশ ঘোষের নাটক যেমন ১৯০৫ সালে লেখা সিরাজদ্দৌলা—বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভূত স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মুসলিম চরিত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। এতে দেখা যায় যে, বঙ্গীয় আধুনিক [হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত নাট্যকারদের মননে] উপনিবেশ বিরোধী জাতীয় সংহতির প্রশ্ন, জাতির কল্পনা ও ঐক্যের ধারণায় মুসলিমদের উপস্থিতি অস্পষ্ট ছিল না । ডিএল রায়ের নাটক যেমন রাণা প্রতাপ সিংহ (১৯০৫), নূরজাহান  (১৯০৮) এবং সাজাহান  (১৯০৯) একইভাবে ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রতিরোধকে নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরে।  রাণা প্রতাপ সিংহ  মহারাজ প্রতাপের মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে গেরিলা প্রতিরোধের কাহিনী-নির্ভর। এই ধরনের নাটকের মাধ্যমে মুসলিম চরিত্রকেও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আনা হয়েছে, এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের ঐক্যবদ্ধ চিত্র ফুটে ওঠে। ফলে দেখা যায়, বাঙালি হিন্দু ধর্ম পরিচয়ের নাট্যকারদের লেখায় মুসলমানরা সবসময় বর্জিত (এক্সক্লুডেড) ছিলেন না। সংকটের সময় এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন হলে তারা নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হন। এর ফলে থিয়েটারের মাধ্যমে কল্পিত জাতি, ঐক্যবোধ এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধের চেতনা প্রকাশ পায়।

ঊনিশ শতকের (এমনকি পরের শতকেরও)আধুনিক নাট্যে সিরাজদ্দৌলা একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। যেমন পরবর্তীতে দেখা যায় যে,  শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ১৯৩৮ সালেও সিরাজুদ্দৌলা লিখেছেন। তখন বিশের দশকে অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর প্রভৃতি সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক তৎপরতা ভারত ছাড় আন্দোলনের দিকে এগোচ্ছে। বিভিন্ন দৃষ্টান্ত পর্যালোচনা করে বলা যায়, সেই সময়ও প্রভাবশালী নাট্যকারেরা চিন্তা করতেন যে ঔপনিবেশিক বাংলাভূমে জাতি বলতে আসলে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সত্ত্বাকেই বোঝায়। এই যৌথসত্ত্বার ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছাড়া ঔপনিবেশিক শাসনের ভয়াবহ দমন থেকে মুক্তি সম্ভব হবে না। এটি একটি চিত্তাকর্ষক (ইন্টারেস্টিং) দিক। ফলে দেখা যায়, তাদের দোদুল্যমানতা ও ফাটল থাকা সত্ত্বেও ঊনিশ শতকে সাহেব-বাবুদের বৈঠকখানায় বাংলা নাটকের সূত্রপাত হয়েছিল। প্রথমে এটি অভিজাতদের বিলাসী, সৌখিন বিনোদন মাত্র। কিন্তু পরে এই বিনোদন রাজনৈতিক হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়, ভাবাদর্শিক সংগ্রামের (আইডিয়োলজিক্যাল স্ট্রাগলের) অংশ হয়ে ওঠে। এতে জাতীয় ঐক্য এবং সংহতির প্রশ্নগুলো উঠে আসতে দেখা যায়।

উপসংহারে বলা যায়, এই নাট্যকাররা তাদের দোদুল্যমানতা, দোলাচল এবং দ্বৈতাবস্থার মধ্য দিয়ে কাজ করেছেন। মুসলমানরা কেবল বাহ্যিক বা পৃথক অংশ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন না, তাদের কল্পনাও নাটকের মধ্যে সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। হিন্দু-মুসলমান যৌথ জীবনের নকশা, সংহতির ধারণা নাটকের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। এই ইতিহাস থেকে আমরা শিখতে পারি যে, ইংরেজ ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া কেবল একক/ব্যক্তিগত আধুনিকতা (সিঙ্গুলার মডার্নিটি) তৈরি করেনি। বরং এটি বিচিত্র আধুনিকতার উদ্ভব ঘটিয়েছে। এই বিচিত্র আধুনিকতার মধ্যেই সংহতির প্রশ্নগুলো নাট্য ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান খুঁজেছে। সংকটের সময় দুই ধর্মের মানুষদের একাত্ম হবার বোধ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে  দেখা যায়। যদিও ১৯৪৭ সালে সেই বোধ পরাস্ত হয়েছে। তথাপি, আমরা ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস থেকে এই পাঠ গ্রহণ করে বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমাদের নিজস্বতা এবং আত্মসত্তার বিস্তৃতি ঘটাতে পারি। থিয়েটার কালচারের ইতিহাস থেকে ডায়ালগ কালচার বা সংলাপের সংস্কৃতি সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারি।  মত-পার্থক্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় নাগরিক সংহতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে সমস্যা নয়, বরং হতে পারে অন্তর্গত প্রাণশক্তি।

লেখক: শাহমান মৈশান, নাট্যকার ও সহযোগী অধ্যাপক, থিয়েটার এন্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নোট: রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ৫৪৭তম পাবলিক লেকচার

cross-circle