
আমাদের সরকার, এলিট গোষ্ঠী, এবং অর্থনীতিবিদগণ সস্তা শ্রমের মানসিক বৃত্তের মধ্যে আটকে আছে। আমাদের এই সস্তা শ্রমের মানসিক ও তাত্ত্বিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। গত ২৪ মে ২০২৫ শনিবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে অনুষ্ঠিত এক বক্তৃতায় এসব কথা বলেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। ‘বৈষম্যহীন সমাজ: তর্ক ও তরিকা- শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা’ শীর্ষক বক্তৃতাটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও আইনেরকথা.কম।
সভাপ্রধানের বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো শ্রমশক্তি জরিপ করে। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যসমূহের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে শ্রমিক সংগঠনসমূহের সঙ্গে পরামর্শের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন , বেশ কিছু সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রস্তুত হলেও সংস্কার কার্যক্রমে ঐকমত্য সৃষ্টি ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক ধরণের হতাশা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বরং আমাদের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বিকল্প উপায়সমূহ খুঁজে বের করতে হবে।
অনুষ্ঠানটিতে মূল বক্তৃতা প্রদান করেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তাসলিমা আখতার। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ।
মূল বক্তৃতায় তাসলিমা আখতার শ্রম সংস্কার কমিশনের ২৫ টি সুপারিশ সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের মধ্যে বাংলাদেশের ৮ কোটি শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা, মর্যাদাপূর্ণ মজুরি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়া, প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারসহ অসংখ্য সুপারিশ সামগ্রিক ও খাত ভিত্তিকভাবে করা আছে। বাংলাদেশের শ্রম জগতে বৈষম্য দূর করতে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয় কেন্দ্রীয় বিবেচনায় না রাখলে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রতিবেদন প্রণয়নকালে কমিশনের সদস্যগণ ভাষার ব্যবহার নিয়ে অধিকতর সতর্ক ছিলেন যাতে শ্রমিকদের নাগরিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। যেমন, নারী শ্রমিককে যেন মহিলা হিসেবে লেখা না হয় এবং কর্ম পরিবেশে তুমি, তুই ব্যবহার পরিহার করা ইত্যাদি। তিনি স্বীকার করেন যে, শ্রম সংস্কার কমিশনে মালিকপক্ষ যুক্ত হওয়ার পর কমিশনের কাজে গতি এসেছিল এবং এতে প্রতিবেদনটির গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আলতাফ পারভেজ তার ব্ক্তৃতার প্রতিবেদনটির শিরোনাম ও সুপারিশসমূহের প্রশংসা করেন। তিনি শ্রম সংস্কার প্রতিবেদনকে অন্যান্য সংস্কার প্রতিবেদনের তুলনায় অধিকতর কেজো এবং বাস্তবায়নযোগ্য বলে অভিহিত করেন। তবে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ধীরগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নয় মাস অতিবাহিত হলেও তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংস্কার সম্পন্ন করতে পারে নি। তিনি বলেন, চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ২০০ টাকা রেখে কোনো সংস্কার কার্যক্রম এগোতে পারে না। তিনি বাংলাদেশের শ্রম সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, সারা পৃথিবীতে মালিক, শ্রমিক ও সরকার- এই তিনপক্ষের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় মডেলের মাধ্যমে শ্রমসমস্যার সমাধান করা হয়। বাংলাদেশে এই ত্রিপক্ষীয় মডেল গড়ে উঠে নি।
অনুষ্ঠানটিতে প্রশ্নোত্তর ও উন্মুক্ত আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী মো. জুলফিকার ইসলাম। তিনি সূচনা বক্তব্যে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়গুলো আলাপ-আলোচনা বিতর্ক হয়, শ্রমিকদের অধিকার সেখানে খুবই প্রান্তিক একটা বিষয়। এ প্রেক্ষিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিন্তাশীল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনার পরিসর তৈরি করতেই রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও আইনেরকথা.কম যৌথভাবে এই বক্তৃতা আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন হক, লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা, সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া, রিডিং অ্যাসোসিয়েটবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং নানা শ্রেণি পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।