
আমি কিন্তু অভাবের চরমতম ফল দূর্ভিক্ষজাত সন্তান। দূর্ভিক্ষ মানে প্রয়োজনীয় খাদ্যের অভাব। যেকোনভাবে নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনগোষ্ঠী যখন তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় নন্যুতম খাদ্যের অভাবে পড়ে এবং চরম পর্যায়ে মারা যায় তখন তাকে দূর্ভিক্ষ বলা হয়ে থাকে।(বাংলাপিডিয়া/অমর্ত্য সেন/রেহমান সোবহান) এ নিয়ে তাত্তিক অনেক সংজ্ঞা রয়েছে। আমি ওইদিকে যাবোনা। আজকের আলোচনায় আমি বাংলার গত দুশ বছরের ইতিহাসের যে অভাব আমাদের সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে সেই মৌলিক অধিকার খাদ্যের অভাবের ইতিহাসের কথা বলবো। আমি কিন্তু স্নো, পাউডার, পারফিউমের অভাব, কিংবা বিলাসী কাপড় কিনতে না পারা কিংবা বসুন্ধরায় গিয়ে শপিং করতে না পারা, কিংবা পিজা হাট, কেএফসিতে খেতে না পারার হা-হুতাশের ইতিহাস বলতে দাড়াইনি। আমি আজকে বলবো খাদ্যের অভাবের ইতিহাস। আরো স্পষ্ট করে বললে খাওয়ার জন্য প্রধান উপাদান চাল না থাকার বা না পাওয়ার ইতিহাসের কথা বলবো।
আমরা যখন মাধ্যমিকে পড়ি তখনো পরীক্ষায় একটি ইংরেজী রচনা প্রায় লিখতে হতো। রাইস আরো স্পষ্ট করে বললে স্টেপল ফুড রাইস। আমি জানিনা এখনো সেই ফরম্যাট আছে কিনা। কিন্তু চাল এখনো আমাদের খাদ্যের প্রধান অনুষঙ্গ।
আমি শুরুতেই আপনাদের বলেছি আমি দূর্ভিক্ষজাত সন্তান। আমার জন্ম চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি বাঁশখালী থানার গন্ডামারা ইউনিয়নে। যেখানে মাত্র ৭ বছর আগে বিদ্যুত গেছে। পাকা রাস্তা হয়েছে একই সময়ে। আমার দাদা মুন্সি মকবুল আলী কোর্টের মুন্সি ছিলেন। তিনি মারা যান ১৯৫৮/৬০ সালে। বাঁশখালীতে তার সময়ে কোর্ট হয়নি। পাশ্ববর্তী থানা সাতকানিয়া কোর্টের অধীনে ছিলো পুরো এলাকা। প্রায় তাকে মামলার কাজে সাতকানিয়া কোর্টে যেতে হতো। ১৯৪৩ সাল। তেমনি এক মামলা শেষ করে কোর্টের কাজ শেষ করেন সাতকানিয়ায়। বাড়ি ফেরার পথে দেখেন একজন মানুষ ১২ বছর মেয়ে ও ৬ বছরের ছেলে, দুটো বাচ্চা নিয়ে সাতকানিয়ার দিকে যাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, এদেরকে কৈ নিয়ে যাচ্ছে। ঐ অভিভাবক বললো, পেটের দায়ে বেঁচে দিতে নিয়ে যাচ্ছি। কেউ যদি নিয়ে যায়। রাঢ়ের কারনে নিজেও খেতে পারছিনা ওদেরকেও খাওয়াতে পারছিনা না। না খেতে পেয়ে ছেলে মেয়ে দুটো মারা যাচ্ছে। আমার দাদার মেয়েটিকে পছন্দ হলো। তিনি আমার দাদিকে কিনে নিয়ে এলেন। আমার দাদিদের বাড়িও ছিলো বাঁশখালীতে। আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে। পরে তিনি আমার দাদিকে বিয়ে করেন। আমার দাদী আমার দাদার দ্বিতীয় স্ত্রী। যদিও বলা হয় বড় দাদী অন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনুমতি নিয়ে দাদা বিয়ে করেছিলেন। তার দু’বছর পরে আমার বাবার জন্ম হয়। আমার দাদা আমার বাবার ১০ বছর বয়সে মারা যান। আপনারা জানেন, ১৯৪৩ সালে বাংলায় ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ হয়। সেই দূর্ভিক্ষে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিলো চট্টগ্রাম ও সিলেট। গ্রামাঞ্চলে এই দূর্ভিক্ষ ৫০ এর রাঢ় হিসেবে পরিচিত। কারন বাংলায় সালটি ছিলো ১৩৫০। যেকারণে আমি নিজেকে দূর্ভিক্ষজাত সন্তান বলতে পারি। দূর্ভিক্ষ না হলে হয়তো আমার দাদার সাথে আমার দাদির বিয়ে হতো না । আমার জন্মও হতো না। ৪৩ এর দুর্ভিক্ষের আগে আরো একটি দূর্ভিক্ষ বাংলাকে পর্যুদস্তু করেছিলো। ৪৩ এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে আলাপের আগে আমি সেই দূর্ভিক্ষ নিয়ে আলাপ করতে চাই।
১. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর:
পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের কাছে বাংলার পরাজয়ের মাত্র ১৩ বছরের ব্যবধানে এই দূর্ভিক্ষ হয়েছিলো। যেটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে সবার কাছে পরিচিতি। কারন বাংলা সনটি ছিলো ১১৭৬। ইংরেজী ১৭৭০। তখন আঠারো শতকের অর্থনেতিক মন্দা চলছিলো। দুর্ভাগ্যবশত অত্যাধিক বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। ইংরেজরা পুরোনা জমিদারী ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছিল। ভুমিরাজস্ব ব্যবস্থা এবং খাদ্যবাজারে মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্মের ফলে অবস্থা চরম অবনতি ঘটেছিলো। যদিও ইংরেজরা পুরো দূর্ভিক্ষের দায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের উপর চাপিয়েছিলো। কিন্তু অমর্ত্য সেন তার দূর্ভিক্ষ নিয়ে গবেষণায় দেখাচ্ছেন, ১৭৬৮ সনে আদায়কৃত রাজস্ব ১৫.২১ মিলিয়ন রুপির চেয়ে ১৭৭১ সনে আদায়কৃত রাজস্বের পরিমান ৫ লাখ ২২ হাজার রূপি বেশি ছিলো। অথচ এর আগের বছরই দূর্ভিক্ষ ঘটে। একদিকে ভুমি রক্ষা করার জন্য ব্রিটিশ রাজের অতিরিক্ত রাজস্ব দিতে গিয়ে ফতুর হয়েছিলো বাংলার মানুষ। অন্যদিকে কোম্পানি শাসনের সহযোগিতায় বাজার থেকে মুনাফাকারীরা লুট করেছিলো। ফলে খাদ্যেরও চরম অভাব দেখা দেয়। ঐ দূর্ভিক্ষে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়।
যেসব কারণে দুর্ভিক্ষ হয়:
ক: ব্রিটিশদের নতুন রাজন্ব ব্যবস্থাপনা
খ. কোম্পানি কর্মচারীদের সহায়তায় মুনাফা
গ. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
২. অভাব: দূর্ভিক্ষ ১৯৪৩: ৫০ পঞ্চাশের মন্বন্তর বা রাঢ়
ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার ৪ বছর আগে এই দূর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিলো এই বাংলা। ৫০ এর মন্বন্তর নামে অধিক পরিচিতি। বাংলাদেশের একজন চিত্রশিল্পী এই দূর্ভিক্ষের ভয়াবহ চিত্র এঁকে বিখ্যাত হয়েছিলেন। আমরা যে জাদুঘরে সভা করছি তার দোতলায় গ্যালারীর বড় একটি অংশ জুড়ে সেই ছবিগুলো রয়েছে। আপনারা সবাই তার নাম জানেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।। তার ছবিগুলোতে দেখা যায় শকুন দুর্ভিক্ষে মৃত মানুষের মাংস খাচ্ছে। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, ভাগাড় থেকে কাক ও মানুষ খাবার খুজছে। এই দূর্ভিক্ষে প্রায় ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিলো।(জেমন জে নোবাক ও বাংলাপিডিয়া)
এই দূর্ভিক্ষ উপমহাদেশে বাংলার উচ্চ স্ট্যাটাসকে ধ্বংস করে দিয়েছিলো বলে মনে করেন গবেষকরা। এই দূর্ভিক্ষের আগ পর্যন্ত এই অঞ্চলে বাংলার অবস্থান ছিলো উচ্চ। ব্রিটিশ রাজের রাজধানী হিসেবে সমৃদ্ধি ছিলো। সাংস্কৃতিকভাবেও এগিয়ে ছিলো। যেকারনে বলা হতো, what Bengal thinks today india thinks tomorrow.
পঞ্চাশের মন্বন্তর এই গর্বে ভয়ংকর আঘাত হেনেছিলো।পুরো বাংলা তার আত্মবিশ্বাস হারিয়েছিলো। নোভাক তার ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত “বাংলাদেশ জলে যার প্রতিবিম্ব” বইয়ে মন্তব্য করেছেন,
“the Bangladesh of today, the nation of aid and poverty, really was created in 1943., the year of its crushing humiliation, the year Bengal fell from its place of leadership in the subcontinent to position of abject poverty.”
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। এ কারণে ক্রমান্বয়ে খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছিল। দূর্ভিক্ষ তদন্ত কমিশন দূর্ভিক্ষের ৪ টি কারণ চিহ্নিত করেছিলো।
ক. প্রদেশে জাপানী আক্রমনের ভীতি এবং সর্বত্র অনিশ্চয়তা। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রিতে সতর্কতা
সরকারী ঘোষণা: জাপান যুদ্ধ ঘোষনার পর সরকার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে জনগণকে দুমাসের খাদ্য মজুদের নির্দেশ দেয়। জনগণ প্যানিক হয়ে পড়ে।
খ. বার্মা থেকে চালের আমদানি বন্ধ। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের বার্মা থেকে চাল আমদানি করতো তাদের রপ্তানিও বেড়ে যায়।
গ. ১৯৪২ সালের প্রথম দিকে প্রত্যাহার নীতি কার্যকর। একটি হলো,ফসলবছর শেষ হওয়া পর্যন্ত সমুদ্র তীরবর্তী মেদিনীপুর, বাকেরগঞ্জ ও খুলনা জেলার স্থানীয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে চাল ও ধান হিসাব করা হয়েছিলো সেগুলো সরিয়ে নেয়া। দ্বিতীয়টি সমদ্রু তীরবর্তী জেলা থেকে ১০ জনের অধিক বহনকারী নৌকা প্রত্যাহার করা।
ঘ. বার্মার পতন ঘটলে প্রদেশে সামরিক ও বেসামরিক নির্মাণ কাজ শুরু করে। ফলে মুদ্রাস্ফিতি বেড়ে যায়।
অমর্ত্য সেন যুক্তি দেখান, ১৯৪৩ সালে বাংলায় তেমন খাদ্য ঘাটতি ছিলো না। কিন্তু এতদসত্তেও দূর্ভিক্ষ হয়। কারণ জনগণের একটি বৃহৎ অংশকে বিনিময় অধিকার দানে ব্যর্থতা ছিলো।
বিনিময় অধিকার মানে হলো, আপনার কাছে খাদ্যশস্য কেনার কিংবা আপনার যা দৈনিক মজুরী তার চেয়ে গড় খাদ্যশষ্যের দাম বেশি। ফলে আগে যেখানে একই পরিমান অর্থ দিয়ে চাল বা খাদ্যশস্য পাওয়া যেতো সেখানে এখন সেটি পাওয়া দুরহ হয়ে পড়ে। (অমর্ত্য সেন;জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি, পৃ. ১২৭ ). ১৯৪৩ সালে এটি হয়েছিলো। সেন বলছেন,
“অর্থনৈতিক স্ফিতি যদি জনসংখ্যার এক বৃহদাংশের পক্ষে লাভজনক হয় (বাংলার দূর্ভিক্ষের সময় যেমন হয়েছিলো কলকাতা শহরের জনগণের পক্ষে) কিন্তু আরেক বৃহদাংশকে বঞ্চিত করে রাখে(যেমন রেখেছিলো বাংলার দূর্ভিক্ষের সময়ে অধিকাংশ গ্রামীন শ্রমিক শ্রেনীকে)। খাদ্যযুদ্ধে তো চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।
এটি ঘটেছিলো কারন সরবরাহ ব্যবস্থা যথাযথ করার ক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থা নেয়নি। উৎপাদনকারীরা তাদের কাছে থাকা উদ্বৃত্তের পুরোটা অধিক মূল্য পাওয়ার প্রত্যাশায় কিংবা ভয়ে বাজারে বিক্রি করতে অনিচ্ছুক ছিলো। আবার ভোক্তাগত প্যানিক হয়ে বতর্মান প্রয়োজনের চেয়ে অধিক ক্রয়প্রবণ হয়ে উঠেছিলো। ব্যবসায়ীরা ফটকামূলক কেনা ও গোপন মজুদের আশ্রয় নিয়েছিলো।
এসব কারণে চালের মূল্য স্তর এতটা উচুতে গিয়েছিলো যে, অনুৎপাদনকারী গরীব শ্রেনীর বৃহৎ অংশ এবং যেসব চাষী তাদের প্রয়োজন মেটানোর মতো উৎপাদন করতো না তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিলো।
১৯৪৩ সালের যে দূর্ভিক্ষ তদন্ত কমিশনের কথা আগেই বলা হয়েছে যে কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন স্যার জন উডহেড এবং সদস্যবৃন্দ ছিলেন এস. ভি রামমূর্তি, মনিলাল নানাবতী, এম. আফজাল হুসাইন ও ডব্লিউ.আর.এক্রয়েড। পুরো ৪৪ সাল কমিশন কাজ করে। কমিশন কতৃক দাখিলকৃত রিপোর্ট তিন অংশে বিভক্ত ছিলো যাতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো সর্বমোট ১৯ টি অধ্যায় ও প্রাসঙ্গিক তথ্যসহ আটটি পরিশিষ্ট। অবশ্য খাদ্যশষ্যের ঘাটতির পরিমান ও বিদ্যমান সরবরাহ বন্টনের মতো বিষয় নিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরে বেশ মতভেদ হয়েছিলো। কমিশনের অন্যতম সদস্য এম আফজাল হোসেন পৃথক বিবরনী দাখিল করেন। কমিশন অবস্থার অবনতির জন্য বাংলার মন্ত্রীবর্গ এবং খাদ্য বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত আমলাদের নীতি ও সিদ্ধান্তসমূহের ধারাবাহিকতাকে দোষারোপ করেন। বিখ্যাত কবি ও লেখক সৈয়দ শাসুল হক তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ“প্রনীত জীবন” এ ৪৩ এর দূর্ভিক্ষের স্মৃতি চারন করেছেন,
“নজির হোসেন চাচা হঠাৎ এক অদ্ভূত কথা বলে ওঠেন,‘শোনো বাদশা, মসজিদের চেয়ে লঙ্গরখানা বেশি শক্তিমান । পঞ্চাশের দূর্ভিক্ষের কালে তুমি তো ছোট নও। দ্যাখো নাই? কিসের আল্লা, ভাতের চাউলই ভগবান!দ্যাখো নাই?
আমি চুপ করে থাকি। দূর্ভিক্ষের কথা কেন তার মনে পড়ে, ঠাহর করে উঠতে পারিনা। মনে পড়ে, আমরা তখন এক বেলা ভাত পেতাম, ভাতের সঙ্গে ছোলা সিদ্ধ মিশিয়ে মা দিতেন। ঈদগা’র মাঠে লঙ্গরখানা মিছিল চোখে ভাসে।-মিছিল করে কংকাল সার আসছে;ভোলাদা, মজিবরদা, বড়খোকাদা, হেরম্বদা, চিত্তদা, দবির মিঞা লাইন করে তাদের খাওয়াচ্ছেন, কলার পাতে পাতে গলা খিচুড়ি ঢেলে দিচ্ছেন হাতা উপুড় করে। মনে নেই আমার?আমিওতো একদিন চুরি করে সারিতে বসে গিয়েছিলাম পাত পেতে।” (পৃ.৪১)
৩. ১৯৭৪ দূর্ভিক্ষ: স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পর মাত্র ৩ বছর পার হয়েছে। ৭০ শুরু থেকেই বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতি শুরু হয়। তবে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ঐতিহাসিক এক রূপান্তর প্রক্রিয়া পার হচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধের কারণে প্রায় ক্ষতির পরিমান ছিলো ১. ২ বিলিয়ন ডলার (জাতিসংঘ)। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে গিয়েছিলো। প্রকৃত আয় কমে গিয়েছিলো। কর্মসংস্থানের অধোগতিও ছিলো অব্যাহত। এমন সময় ১৯৭৪ এর জুন-আগষ্টে অভূতপূর্ব বন্যা হয়। এটি খাদ্য সংঙ্কটকে তরান্বিত করে। একদিকে আউশের ফলন ক্ষতি অন্যদিকে আমন ধান রোপন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তবে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য রেহমান সোবহান বলেছেন, বন্যার কারণে উৎপাদন হ্রাস ও মাথাপিছু খাদ্য উৎপাদন কম হওয়ার চেয়ে
ক্রমবর্ধমান মজুদদারী
ফটকাবাজি
ও আমদানি ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বেশি দায়ী ছিলো।
তার পর্যবেক্ষন
ক. বন্যার কারণে ব্যাপক ঘাটতির আশংকায় গ্রামীণ বড় ও ছোট কৃষি উৎপাদনকারীদের আউশ ও বোরো বাজারজাত না করা
খ. সরকার মজুদ হ্রাস ও আমদানি ব্যর্থতার সম্ভাব্য খবর মজুদদাররা গোপনে জেনে আগষ্ট থেকে খোলা বাজারে ধান চাল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। অক্টোবর মাসে চালের দাম মন প্রতি সর্বোচ্চ ২৬৩ টাকা হয়। যা ওই বছরের ফেব্রæয়ারীর চেয়ে প্রায় ৩.৩ গুন বেশি।
আগষ্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দূর্ভিক্ষে রংপুর, ময়মনসিংহ সিলেট অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। খাদ্যশস্যের জন্য বাজারের উপর নির্ভরশীল কৃষকশ্রেনীর পক্ষে এই মুল্যবৃদ্ধিও মারাত্মক ফল হয়। গরীবদের পক্ষে তাদের আয় দিয়ে খোলাবাজার থেকে চাল কেনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। (হাল খাতা,২০০৯, পৃ.২৬)
রংপুর অঞ্চলে দূর্ভিক্ষের প্রভাব ছিলো মারাত্মক। প্রায় ২৫ হাজার লোক মারা যায়। সেখানকার মানুষ সেই সময় ভিটে মাটি হালের বলদ বিক্রি করে ঢাকায় এসে রাজপথে অনাহারে মারা যায়। দূর্ভিক্ষে মৃত্যুর হিসাব নিয়ে তারতম্য আছে। সরকারী হিসেবে ২৭ হাজার বলা হলেও বেসরকারী হিসেবে ১ লক্ষ লোক মারা গেছে বলে প্রকাশ পায়(হালখাতা, পৃ.২৭)
সরকার দূর্ভিক্ষ থেকে মানুষকে বাচাতে প্রায় ৬ হাজার লঙ্গরখানা খুলেছিলো। এর মধ্য দিয়ে অক্টোবর নভেম্বর সময়ে প্রায় ৪৩ লক্ষ লোককে কোন মতে খাবার দিয়ে প্রাণে বাচানো গেছে বলে ঐ সময়ের সরকার মনে করে। রেহমান সোবহান মন্তব্য করেছেন,
“চরম খাদ্য ঘাটতি অপেক্ষা দূর্ভিক্ষ অনেকাংশে মানুষের তৈরী ছিলো। এর আশু কারন ছিলো ফসল উৎপাদনকারী এবং খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীদের মজুত ও ফটকাবাজি। স্থানীয় তীব্রতার মূলে ছিলো খাদ্য মন্ত্রণালয়ের রক্ষণশীলতা।এই মন্ত্রণালয় বিধিবদ্ধ রেশনের পরিমান কমিয়ে রংপুরের মতো চরম খাদ্যাভাবগ্রস্থ মানুষকে খাওয়াতে পারতো।”
এই সময়ে রফিক আজাদ তার বিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন যার লাইন এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে“ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাবো”
৭৪ এর দূর্ভিক্ষের আরেকটি কারন পরবর্তীতে গবেষণায় পাওয়া যায়। ঐ সময়ে বাংলাদেশে সংবাদপত্র স্বাধীন ছিলোনা। ফলে সরকারের পক্ষে খাদ্য সংকটের প্রকৃত তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। যেটি অমর্ত্য সেনের গবেষণার সাথে মিলে যায় । তিনি দেখিয়েছেন, “আগাম ক্ষুধার সংবাদ কত তাড়াতাড়ি কত বলিষ্ঠভাবে প্রচারিত হয় এবং রাজনৈতিক বিতর্কে স্থান পায় তা দূর্ভিক্ষের বাস্তব প্রতিরোধকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করে। খবরের মাধ্যমগুলোকে প্রকৃত স্বাধীনভাবে এবং বিরোধী দলগুলির ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠা দূর্ভিক্ষের কার্যকর প্রতিরোধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।( অমর্ত্য সেন, পূর্বোক্ত, পৃ.১৩২)
৪. ২০০৭ ও ২০১৭ এর চাল সংকট:
এগুলো একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনা। ২০০৭-০৮ সালে চাল সংকট দেখা দিয়েছিলো। এ সময়ে বন্যায় প্রায় ২৫ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়।(খাদ্য অধিদপ্তর/প্রথম আলো) আবার ১/১১ এর সেনা সমর্থিত তত্ত¡াবধায়ক সরকার দূর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছিলো। ফলে ব্যবসায়ীরাও চাল আমদানি করছিলো না। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী পরে সরকার ব্যবসায়ীদের আস্থায় এনে চাল সংকট মোকাবেলার চেষ্টা চালায়। ঐ সময় মোটা চালের দাম কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিলো। ২০০৭ এ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমান প্রায় ২০ লাখ ৪৭ হাজার টন চাল আমদানি হয়। (যুক্তরাষ্ট্র কৃষি সংস্থা ইউএসডিআর)
পরবর্তীতে চাল উৎপাদন বাড়তে থাকলে সরকার আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে শূল্ক বাড়াতে থাকে। ২০১৪ সাল থেকে এ শুল্কের পরিমান ২৮ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়। বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিনত হয়। গত ৪ বছর আমরা খাদ্যে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে ছিলাম।
আবারো সমস্যা তৈরী করে হাওর ও উত্তরের বন্যায় এই বছর। খাদ্য অধিদপ্তর ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বছরের আমাদের ধান চালের চাহিদা ৩ কোটি মেট্রিক টন। উৎপাদন হয় প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। সেই হিসেবে ৬০ লাখ উদ্বৃত্ত থাকার কথা। উৎপাদনের কারণে গত ৩ বছর বাংলাদেশ কোন ধরণের ধান চাল আমদানি করেনি। বিআইডিএসের চেয়ারম্যান কে. এস মুরশিদ চ্যানেল আইকে জানিয়েছেন, এ কারণে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরণের সুখী ভাব মন্ত্রনালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে তারা প্রকৃত পরীবীক্ষন করেনি। সরকারও চাল সমস্যাকে মিডিয়ার অতিরঞ্জন বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। ১০ বছরের মধ্যে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম সর্বোচ্চ পর্যায় ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। শুল্ক কমিয়ে চাল আমদানির দাবি উঠলেও খাদ্য মন্ত্রণালয় এ দাবিকে আমলে নেয়নি। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রবক্তা জানতে চান, তারা সরকারকে চাল সমস্যার আগাম পূর্বাভাস দিয়েছিলেন কিনা? তিনি জানান, তারা হাওরের বন্যার সাথে সাথে ৯ এপ্রিল চাল সমস্যার পূর্বানুমান জানিয়েছিলেন। সমস্যা মোকাবেলায় ক্রমান্বয়ে শুল্ক কমানোর প্রস্তাবও করেছিলেন।
র্দীঘদিন ধরে চাল ব্যবসার সাথে জড়িত এ আর রাইসের কর্ণধার আবদুর রশিদ মজুমদার জানান, তারা সরকারকে এ সমস্যার কথা জানিয়ে শুল্ক কমানোর আহান করেছিলেন। কৃষক বাচানোর কথা বলে কোন কোন আমলা তাদের বলেছিলেন, মানুষের কাছে এখন টাকা আছে। ১০ টাকা বাড়লে কিছু হবেনা। খাদ্য মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত চাল আমদানির শুল্ক কমিয়ে আমদানি নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়। আমদানি চাল বাজারে আসতে আসতে অক্টোবর হয়ে যায়। ইতোমধ্যে চালের দাম বাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের বড় একটি অংশ অতিরিক্ত দাম মেটাতে ঋণ গ্রস্থও হয়ে পড়ে। মোহাম্মদপুর খুচরা বাজারের এক তরুণ অ্যাডভোকেট জানান, তিনি আগে মিনিকেট খেতেন, এখন দামের কারণে বিআর-২৮ খাচ্ছেন। নাখালপাড়ার সমিতি বাজারে এক আলকাতরা ফ্যাক্টরির কর্মচারীর জানান, বিআর-২৮ বাদ দিয়ে তাকে মোটা চাল থেকে হচ্ছে।
সরকার তড়িঘড়ি করে ভিয়েতমান থেকে ২.৫ লাখ টন মোটা চাল নিয়ে আসে। যার ৫০ লাখ এনেই দেখা যায়, রাজধানীর মানুষ এ চাল খায়না। ফলে সরকারের কম মুল্যে খোলা বাজারে চাল বিক্রি কর্মসূচিও ভেস্তে যায়।
পূর্বে উল্লেখিত ব্যবসায়ী আমাকে জানিয়েছেন, চাল সমস্যা দেখা দিলে সবচেয়ে বড় মজুদদার হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। সংকটের ভয়ে তারা অতিরিক্ত চাল কেনে। আবার এক শ্রেনীর মৌসুমী চাল ক্রেতা তৈরী হয়। যারা মজুদ করে। বাজারে চালের সংকট তৈরী হয়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি প্রবাদ আছে, “কিরে হন মড়কার (গুদামের) ভাত খর। মুখ তো নবাবর নান লার (কিরে কোন গুদামের ভাত খাচ্ছিস। চেহারার তো নবারের মতো হয়ে গেছে।
বাংলায় ভাত একটি স্ট্যাটাস সিমবল। কে কি ধরণের ভাত খায় সেটি তার স্ট্যাটাস। তাই চাল সংকট হলে মানুষের স্ট্যাটাসের নিম্নগতি হয়। আর নিম্ন বিত্তের মানুষের উঠে নাভিশ্বাস।
সবগুলো সংকট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ধান চালের মতো মৌলিক পণ্যের সংকটের ক্ষেত্রে সরকারের সঠিক পর্যালোচনা ও সেই অনুযায়ী সঠিক সময়ে নীতি গ্রহন জরুরী। অন্যথায় মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধান দামে অনকে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
আমি একটি কবিতার মধ্য দিয়ে আজকের বক্তব্য শেষ করছি।
ভাত দে হারামজাদা
- রফিক আজাদ
ভীষণ ক্ষুধার্ত আছিঃ উদরে, শরীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভূত হতে থাকে- প্রতিপলে- সর্বগ্রাসী ক্ষুধা
অনাবৃষ্টি- যেমন চৈত্রের শষ্যক্ষেত্রে- জ্বেলে দ্যায়
প্রভুত দাহন- তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোন দাবী
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায়
বাড়ি, গাড়ি, টাকা কড়ি- কারো বা খ্যাতির লোভ আছে
আমার সামান্য দাবী পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর-
ভাত চাই- এই চাওয়া সরাসরি- ঠান্ডা বা গরম
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চাল হ’লে
কোনো ক্ষতি নেই- মাটির শানকি ভর্তি ভাত চাই
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য-সব দাবী;
অযৌক্তিক লোভ নেই, এমনকি নেই যৌন ক্ষুধা
চাইনিতো নাভি নিম্নে পরা শাড়ি, শাড়ির মালিক;
যে চায় সে নিয়ে যাক- যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে দাও
জেনে রাখোঃ আমার ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই।
যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবী
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কান্ড ঘ’টে যাবে
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন কানুন-
সম্মুখে যা কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে
থাকবে না কিছু বাকি- চলে যাবে হা ভাতের গ্রাসে।
যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে ধরো পেয়ে যাই-
রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার হবে।
সর্বপরিবেশগ্রাসী হ’লে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ করে।
দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো : গাছপালা, নদী-নালা
গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব প্রধান নারী
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ
ভাত দে হারামজাদা,
তা না হলে মানচিত্র খাবো।