
২৮১তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
বিষয়: পিটার ড্রাকার—আধুনিক ম্যানেজমেন্ট বিদ্যার গুরু
বক্তা: জুলফিকার ইসলাম
তারিখ: ১৩ অক্টোবর, ২০১৭
আমরা ম্যানেজমেন্ট চর্চায় পিছিয়ে আছি, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ম্যানেজমেন্ট চর্চা হয় তা অপর্যাপ্ত । এর একটি প্রমাণ হলো আমেরিকা ও জাপানে ২০ শতকের দ্বিতীয় ভাগ জুড়ে কর্পোরেট বিশ্ব যাকে গুরুর আসন দিয়েছিল সেই পিটার ড্রাকার বাংলাদেশে বেশ অপরিচিত।
পিটার ড্রাকার ছিলেন লেখক, অধ্যাপক, ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট। ৩৯ টি বই লিখেছেন, হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দি আটলান্টিক জার্নালে লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ। আমেরিকার বড় বড় কর্পোরেশন–-জেনারেল ইলেক্ট্রিক, কোকা-কোলার মতো প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্ট, নিউইর্য়ক ইউনিভার্সিটি, ক্ল্যারমোন্ট গ্রাজুয়েট ইউনিভার্সিটিতে সামাজিক বিজ্ঞান ও ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে অধ্যাপনা, আর চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী একেকটি ম্যানেজমেন্ট আইডিয়া তাকে পরিণত করেছে বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তানায়কদের একজনে।
পিটার ড্রাকারের প্রথম বই “The End of Economic Man: of New Totalitarianism” প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৯ সালে। পুঁজিবাদী self-interest এর পরিবর্তে যে ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদী আবেগে বুদ হয়েছিল পুরো ইউরোপ, তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে তিনি লিখেছিলেন এই বই। তাঁর বইগুলোর নাম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি ১৪ টি বইয়ের শিরোনাম দিয়েছেন ফিউচার, নেক্সট, নিউ এবং টুমোরো শব্দ দিয়ে। যেমন: দ্য ফিউচার অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যান (১৯৪২), দ্য নিউ সোসাইটি (১৯৫০), ল্যান্ডমার্ক্স অব টুমোরো (১৯৫৯), ম্যানেজিং ইন দ্য নেক্সট সোসাইটি (২০০২)। তার ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর । তাই হার্ভার্ড প্রফেসর রোজাবেথ মস কান্টার বলেন, “পিটার ড্রাকারের চোখের চশমায় অবশ্যই স্ফটিক বল আছে কারণ তিনি অনেক প্রবণতার পূর্বানুমান করেছিলেন (Peter Drucker’s eyeglasses must contain crystal balls because he anticipated so many trends.”
পিটার ড্রাকার ম্যানেজমেন্টকে দেখেছেন একটি সামাজিক কর্ম হিসেবে। এটি সংস্কৃতি এবং মানুষের সঙ্গে গ্রথিত। তিনি বলেন, কেইনসসহ অন্যান্য অর্থনীতিবিদ বাজারে পণ্যের আচরণ নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু তার আগ্রহ ছিল মানুষের আচরণে ও বিকাশে। তাই তিনি লিখেছেন দ্য ইফেক্টিভ এক্সিকিউটিভ (১৯৬৭), পিপল অ্যান্ড পারফরমেন্স : দ্য বেস্ট অব পিটার ড্রাকার অন ম্যানেজমেন্ট (১৯৭৭), ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ (১৯৮৫)।
পিটার ড্রাকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু আইডিয়া পুরো অর্থনৈতিক লিটারেচারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার মধ্যে একটি হলো নলেজ ওয়ার্কার, ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত “ল্যান্ডমার্কস অব টুমোরো” বইটিতে তিনি এই শব্দযুগল প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, ইতিহাসে জ্ঞানকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হতো। পশ্চিমে প্লেটো ও সক্রেটিস এবং পূর্বে তাওইস্ট ও জেন সাধুদের মতে, জ্ঞানের উদ্দেশ্য এবং কাজ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক ঋদ্ধির মাধ্যমে নিজেকে আলোকিত করা। কিন্তু ১৭০০ সালের দিকে জ্ঞানের অর্থ ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। জ্ঞান কোনো কিছু হয়ে ওঠার থেকে কোনো কিছু তৈরি করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। জ্ঞানের এই ব্যবহার তিনটি বিপ্লবের—-- যথা শিল্প বিপ্লব, উৎপাদনশীলতা বিপ্লব ও ম্যানেজমেন্ট বিপ্লব— জন্ম দিয়েছে। ড্রাকার মনে করেন, জ্ঞানই সেই শক্তি যা কমিউনিস্ট, পুঁজিবাদী উভয় সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে নতুন পোস্ট-ক্যাপিটালিস্ট সমাজ ব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে । পুঁজি এবং শ্রমকে গৌণ করে জ্ঞানই হবে উৎপাদনের মুখ্য উপাদান।
ড্রাকারের মতে, এই জ্ঞানভিত্তিক সমাজে প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য হবে জ্ঞানকে উৎপাদনশীল করে তোলা—উপকরণ, পণ্য, প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত উন্নয়ন সাধন করে সেগুলো অধিকতর উৎপাদনশীল করে তোলা। এই সমাজে প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু সেই কাজই করবে যে কাজে সে বিশেষজ্ঞ। আর বাকি কাজগুলো সে আউটসোর্স করবে। নলেজ সোসাইটির সংগঠনগুলো বিশেষজ্ঞদের জন্য সমান সুযোগ সরবরাহ করবে । কেউ কারো বস, অধ:স্তন হিসেবে থাকবে না। এই সমাজের উদ্দেশ্য হবে পুরনো প্রথা, কৌশল, ব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নয়ন সাধন করা। এই সমাজে বিকেন্দ্রীকরণ হবে, ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই সমাজ গতিশীল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে।