
২৮০ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
বিষয়: মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতি সাধনা
বক্তা: ইফতেখারুল ইসলাম
তারিখ: ৬ অক্টোবর, ২০১৭
বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অনালোচিত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম হলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬)। সারাজীবন নিজেকে উৎকর্ষ করার মধ্যদিয়ে অন্যদেরও এ পথে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি লিখেছেন অত্যন্ত অল্প; কিন্তু তার চিন্তার বহর অভাবনীয়ভাবে বিশাল। মানুষকে কিভাবে প্রাণীত্ব থেকে মনুষত্ত্বে উত্তীর্ণ করা যায়- এই কঠিনতর যুদ্ধে তিনি নিজেকে সারাজীবন নিবিষ্ট রেখেছেন।
বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে তিনি কবি, প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার রচনাগুলো খেয়াল করলে আমরা দেখব যে, তিনি মানুষের কতিপয় মৌলিক বিষয়াবলি নিয়ে ধ্যান করেছেন। তিনি চেয়েছেন কীভাবে একজন মানুষের জীবন সুন্দর, বিকশিত করা যায়। রবীন্দ্রনাথের পরে মানুষের জীবনের সৌন্দর্য নিয়ে এভাবে ফোকাস করে কেউ ভাবেননি। তার রচনার পুরোটাই একটি বিষয়কেন্দ্রিক। বলা যায়, তিনি একটি ডিসকোর্স নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তার এই ডিসকোর্সটি হলো ‘কিভাবে মানবজীবন সুন্দর করা যায়’ অর্থাৎ তিনি মানুষকে সংস্কৃতিবান হতে প্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি আমাদের সমাজে একজন দুর্লভ দার্শনিক। তাকে আমরা দার্শনিক বলব একারণে যে, তিনি মানুষের মৌলিক বিষয় নিয়ে ভেবেছেন এবং একটি বিশেষ ডিসকোর্সের নির্মাণ করেছেন। তার এই ডিসকোর্সটি হলো ‘সংস্কৃতির সাধনা’।
ব্যক্তি জীবনে আমরা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। ব্যক্তির সমন্বয়েই রাষ্ট্র। ব্যক্তি জীবনে রয়েছে ব্যথা, বেদনা, সফলতা-ব্যর্থতা, গ্লানি, জয়-পরাজয়, সুখ-শান্তি, অসুস্থতা-সুস্থতা ইত্যাদি। মোতাহের হোসেন চৌধুরী জীবনের এসব মৌলিক বিষয় নিয়ে সুদীর্ঘ সময় তন্নিষ্ট হয়ে ভেবেছেন এবং তার চিন্তাগুলো আমাদের কাছে উন্মোচন করেছেন। এসব চিন্তায় তার অভাবনীয় শাণিত প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। এসব চিন্তার মধ্যে রয়েছে এক অসাধারণ ভারসাম্য। তিনি জীবন ও জগতের মধ্যে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কের চিত্র আমাদের মাঝে উপস্থাপন করেছেন। জগতের কোনো কিছুই তার কাছে অনর্থক নয়। আবার সবকিছুই বিবেচনাহীনভাবে তিনি গ্রহণ করতেও নারাজ। তার এসব চিন্তায় রয়েছে অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা। ব্যক্তি জীবন সুন্দর করার ক্ষেত্রে তার এসব চিন্তা অত্যন্ত কার্যকর দিকনির্দেশনা। আর ব্যক্তি জীবন সুন্দর মানে রাষ্ট্রের সৌন্দর্য সুনিশ্চিত করা।
মোতাহের হোসেন চৌধুরী স্নাতক পাশ করে নিজের পীঠস্থান ইউসুফ উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানেই তার সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। এসময় ঢাকার সাহিত্য সমাজের সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘটে এবং উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ লাভ করেন। প্রথম জীবনে তিনি কবিতা লিখতেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সভ্য কাজী আবদুল ওদুদ উল্লেখ করেছেন যে, সতেরো-আঠারো বছর বয়সে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কবিতা মাসিকপত্রে ছদ্মনামে প্রকাশিত হতো। ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো ‘ মোহোচৌ’। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে মুসলিম সাহিত্যসমাজের সান্নিধ্যে এসে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর বিশেষ বাকবদল ঘটে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, বার্টান্ড রাসেল, ক্লাইভ বেল প্রমুখ চিন্তক দ্বারা তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
তার জীবৎকালে কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিনটি। তার মধ্যে একটি প্রবন্ধ সংকলন ও দুটি অনুবাদগ্রন্থ। মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমি ১৯৭০ সালে তার বিখ্যাত ‘সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করে। সভ্যতা শিরোনামে ক্লাইভ বেল (১৮৮১-১৯৬৪)-এর Civilization গ্রন্থের অনুবাদ করেন। এটি বাংলা একাডেমি ১৯৬৫ সালে প্রকাশ করে। তিনি বার্টান্ড রাসেলের The Conquest of Happiness (১৯৩০) বইয়ের অনুবাদ করেছিলেন, যা ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
১৯৮৮ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তার জীবনী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার জীবনী লিখেছেন। গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদের সম্পাদনায় এক খণ্ডে মোতাহের হোসেন চৌধুরী রচনাবলি প্রকাশিত হয়।