গোপাল ভাঁড়: সমাজ-ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আলোকে
অক্টোবর ১২, ২০২৫

গোপাল ভাঁড় কে ছিলেন

 গোপাল ভাঁড় রসপ্রিয় বাঙালির মৌখিক ঐতিহ্যের যথাযোগ্য প্রতিনিধি। তাঁর লেখাগুলোতে হাসির রেখার পাশাপাশি হাসির নেপথ্যে গুপ্তঘাতকের মতো মিছরির ছুরি রয়েছে। লোকশিক্ষা,নীতিশিক্ষা ও মোটাদাগে সমাজসংস্কারের বিষয় আছে। উনিশ শতকের শুরুতে সদ্য গঠিত নগর কলকাতায় বিপুল পসার জমানো বটতলাকেন্দ্রিক সাহিত্যের অন্যতম হাতিয়ার ছিলো এই গোপাল ভাড়েঁর গালগল্প। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই গোপাল ভাঁড় কে ছিলেন ? আদতেই কি এই নামে কেউ ছিল ? অথবা গোপাল একাধিকজনের সমষ্টি ?

বাঙালের গোপাল ভাঁড়-দর্শন

অনেক পন্ডিতের মতে বাংলা অঞ্চলের প্রবল প্রতাপশালী চরিত্র নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের (১৭১০-৮৩) সভায় গোপাল ভাঁড় ছিলেন। যদিও এর পক্ষে কোন স্থির সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও এই মতের পক্ষেই অধিকাংশের সায় রয়েছে। অজিতকুমার ঘোষ তাঁর ‘বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা’ বইয়ে লিখেছেন ‘গোপাল রসিক- চূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভার ভাঁড় ছিলেন ’। ১৯৫২ সালের হোমশিখা পত্রিকায় ‘গোপাল ভাঁড়ের নামে প্রচলিত গল্পসংগ্রহ’ নামক প্রবন্ধে অধ্যাপক মদনমোহন গোস্বামীও একই কথা লিখেন। তিনি লেখেন ‘শোনা যায় , মহারাজের (রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের) সভায় আরেকটি রত্ন ছিলেন-তিনি স্বনামখ্যাত রসসাগর গোপাল ভাঁড় ’।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়ের সময় থেকে বর্তমান সময়ের দূরত্ব মাত্র ৩০০ বছরের। কিন্তু ৩০০ বছর আগেকার কৃষ্ণচন্দ্র ,ভারতচন্দ্র সম্পর্কে যেখানে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব নেই, সেখানে গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে এত ধোঁয়াশা থাকবে কেন ? এই ধোঁয়াশার কারণ হিসেবে বলা যায় একেক মুনির একেক মত।

সুকুমার সেন,পরিমল গোস্বামী,অতুল সুর কি অজিতকৃষ্ণ বসু প্রমুখ পন্ডিত গোপাল ভাঁড়ের বিভিন্ন প্রসঙ্গে যখন দ্বিধাবিভক্ত , ১৯২৬-এ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) বঙ্গভূমিতে মৃদু কম্পন জাগাল ‘নবদ্বীপ কাহিনী বা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়’ নামের একটি বই। শ্রীনগেন্দ্রনাথ দাস এই বইয়ের লেখক । তিনি নিজেকে গোপাল ভাঁড়ের বংশধর দাবি করলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সুনির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি হিসেবে গোপাল ভাঁড় উপস্থিত হলেন। অতীতে অনেকে গোপালের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও তাঁর বংশের ঠিকুজি কেউ মেলে ধরতে পারেননি। নগেন্দ্রনাথের মতে, গোপালের প্রকৃত নাম ছিল গোপাল চন্দ্র নাই। তিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ অন্তঃপুরের ভান্ডারের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। ফলে গোপাল চন্দ্র নাই থেকে তাঁর পদবি হলো ভান্ডারি। ভান্ডারি থেকে আরও পরে ভাঁড়।

গোপালের বাবার নাম হল দুলাল চন্দ্র নাই। তাঁর প্রপিতা হলেন আনন্দরাম নাই। জাতিতে তারা নাপিত। তবে দুলাল চন্দ্র নবাব আলির্বদী খাঁর শল্যচিকিৎসক বা বৈদ্য ছিলেন। ‘তৎকালে অস্ত্র-চিকিৎসা নাপিত জাতির অধিকৃত ছিল’ মন্তব্য করে নগেন্দ্রনাথ দাস ‘নবদ্বীপ কাহিনীতে’ তথ্য দিয়েছেন যে গোপালরা দুই ভাই ছিলেন। গোপালের জন্ম অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি মুরশিদাবাদে। নগেন্দ্রনাথ আর লিখেছেন যে,মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় গোপালের গুণে মুগ্ধ  হইয়া তাঁহাকে গোয়াড়ী কৃষ্ণনগরে লইয়া যান। গোপাল বাল্যকাল হইতে চতুর ও হাস্যোদ্দীপক বাক্যাবলী প্রয়োগে বিশেষ পটু ছিলেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্যের ন্যায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের একটি পঞ্চরত্নের সভা ছিল। মহারাজ কৃষ্ণ গোপালের প্রত্যুৎপন্নমতি ও বাকপটুতা দেখিয়া তাঁহাকে স্বীয় সভায় অন্যতম সদস্য পদে নিযুক্ত করেন। গোপালের একটি পুত্র ও রাধারাণী নামে একটি কন্যা ছিল। রাধারাণীর উমেশ ও রমেশ নামে দুটি সন্তান ছিল। বহুদিন হলো সে বংশ লোপ পাইয়াছে ’।

খটকার রাজ্য  ও গোপাল

নগেন্দ্রনাথ মহাশয়কে এককথায় গোপালের বংশধর মেনে নিলে কথা ছিল না। কিন্তু পণ্ডিতরা আপত্তি তুললেন। তারা বললেন,কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর সভাসদ কবি ভারতচন্দ্র ও সংগীতজ্ঞ রামপ্রসাদ দুজনকেই জমি দান করেছিলেন। যদি গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রের প্রিয়পাত্র ও ওই আমলের লোক হন ,তবে নদীয়া বা কৃষ্ণচন্দ্রের তাঁর কোনো ভূসম্পদ থাকার প্রমাণ নেই কেন ? এমনকি কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়ির মহাফেজখানায় গোপালের অস্তিত্ব বিষয়ে কোনো দালিলিক প্রমাণাদি নেই। তাঁর কোনো ছবিও নেই। মধ্যযুগের বিশিষ্ট কবি ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর সভাসদদের অনেকের সম্পর্কে লিখলেও লক্ষণীয়ভাবে এতে গোপাল ভাঁড় বিষয়ে কোন টু শব্দটিও নেই। গোপাল যদি তাঁর সমসাময়িক এবং একই সভার সদস্য হতেন ,তবে ভারতচন্দ্রের লেখায় তাঁকে পাওয়া যেতই-এই তাঁদের ফয়সালা। গোপালের মা আর বউ সম্পর্কে ইতিহাস বিস্ময়করভাবে নীরব। তাঁরা কেবল গল্পেই বেঁচে আছেন। গোপালের উত্তরাধিকারী বিষয়ে লেখকেরও দাবি নিয়েও গোপালের বড় ভাই কল্যাণের বংশ-পদবি ‘নাই’ হলে তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম নগেন্দ্রনাথের পদবি ‘দাস’ কেন ? এ সম্পর্কে নগেন্দ্রনাথ নিরুত্তর।

গোপাল ভাঁড় নস্যাৎ হয়ে গেছেন ?

বাঙালির আদরের এই ধনটির তাহলে কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই ? গোপাল ভাঁড় নস্যাৎ হয়ে গেছেন ? অগত্যা এ বিষয়ে আরেক প্রস্থ ঘাঁটাঘাঁটি করতেই হয়। গোপালকে নিয়ে আরও যেসব বিষয়-আশয় মাথার মধ্যে গোলমাল পাকায়, সেগুলো তাঁর জাতি,বাসস্থান,পড়ালেখা,পদবি প্রভৃতি তথ্যের বিভিন্নতা। ‘জাতিতে নাপিত’-এর বিপরীতে কোনো কোনো গবেষক গোপালকে কায়স্থ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অনেকের মতে গোপাল কৃষ্ণনগরে বাস করতেন। ‘বাঙ্গালা ক্ষিতীশ বংশালী’ গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী গোপাল ছিলেন শান্তিপুরের বাসিন্দা। কথিত আছে,তাঁর বাড়ি ছিল ঘূরণীতে । আবার নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত ‘বিশ্বকোষ’-এ পাওয়া যাচ্ছে,গোপালের বাড়ি গুপ্তিপাড়া। কারও ভাষায়, তিনি পড়ালেখা জানতেন। কেউ বলেছেন,জানতেন না। আর এই মহাত্মার পদবি নিয়েও  আছে যথেষ্ট দ্বন্দ্ব-নাই,বিশ্বাস,হার্স্যাণব,ভান্ডারি,ভাঁড়-তবে কোনটি সঠিক ? শুধু তথ্যের পর তথ্য । কিন্তু মজার ব্যাপার হলো,গোপালের বিয়ে ও মৃত্যু নিয়ে ইতিহাস ভীষণ চুপচাপ।

গোপাল ভাঁড় আছেন

বাস্তব চরিত্রের শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে গোপাল ভাঁড়ের আকারে-গড়নে বেশ খানিকটা খামতি হয়তো আছে, সে ক্ষেত্রে তিনি সামষ্টিক মানুষের কল্পিত কোনো অবয়ব,না বাস্তব একটি চরিত্র-এ বিতর্ক অনিঃশেষ। তাঁর প্রতিটি গল্পই মানুষের মুখে মুখে জনপ্রিয় হয়েছে। তাই মৌখিক সাহিত্য যে প্রক্রিয়ায় বাহিত হয়-কোনো ব্যক্তি যখন চমকপ্রদ কোনো গল্প শোনেন, তাঁর অজান্তেই গল্পটি কিছুটা বদলে যায়-এভাবেই কি গোপাল জনমানসে পৌঁছেছেন ? শেষ পর্যন্ত গোপাল ভাঁড় আছেন। তিনি নিম্নবর্গের বাঙালির প্রতিনিধি হয়ে,তাঁদের হাস্যরসে,দুঃখেও রয়েছেন। এই বাংলার সামন্ততান্ত্রিক সমাজে একটা যখন ছিল নগরসভ্যতার উন্মেষকাল,তিনি সেই সমাজের রাজনৈতিক চেতনা ,বিবেক ছিলেন। আর গোপালের রাজনৈতিক চেতনা পরিস্ফুটিত হয়েছিল ভাঁড়ামির ছদ্মবেশে ।

রিডিং ক্লাব ট্র্রাস্টের ৩১০তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারে পঠিত। ১৩ জুলাই, ২০১৮; শুক্রবার। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।

cross-circle