ডালিয়া চাকমা, উন্নয়নকর্মী ও লেখক
আমি রিডিং ক্লাব ট্রাস্টকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আইনেরকথা-কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আজকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আদিবাসী নারীদেরকে নিয়ে এই বিশেষ আয়োজনের জন্য। সাধারণত এটা খুবই বিরল একটা দৃশ্য মূলধারার মঞ্চে (মেইনস্ট্রিম প্লাটফর্মগুলোতে) যেখানে আদিবাসী নারীদেরকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমি জানি না, হরেদরে আপনাদের কাছে এ ধরনের কোনো প্রোগ্রাম চোখে পড়ে কিনা। এটা খুবই দুঃখজনক, কিন্তু সত্যি। আমাদের শুনতে অস্বস্তি লাগতে পারে, কিন্তু আরিফ খানের মতো আমিও অনুরোধ করব, আদিবাসী নারীদেরকে নিয়ে আলাদাভাবে প্রোগ্রাম করতে এবং তা আসলে হওয়া দরকার। কারণ আমরা জানি, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি নারী যে ধরনের বৈষম্য কিংবা যে ধরনের সহিংসতার শিকার হন, আদিবাসী নারীর ক্ষেত্রে সহিংসতার ধরনটা কিছু জায়গায় সমজাতীয়, আবার কিছু জায়গায় ভিন্ন। এখানে আরো অনেকগুলো বিষয় আছে, যেমন দলিত যারা আছেন, তাদের সহিংসতার ধরন ভিন্ন। সবগুলো নিয়ে যখন কথা বলব, এখানে আসলে আলাদা আলাদা করে কথা বলতে হয়।
আমরা যারা নারী অধিকার নিয়ে কাজ করি আমাদেরকে শুনতে হয়, আলাদা করে বলার কী দরকার। আমি যখন আদিবাসী নারী হিসেবে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যকার পিতৃতান্ত্রিক চর্চাগুলো নিয়ে কথা বলছি, তখন শুনতে হয় যে আমাদের মধ্যে তো এ ধরনের সমস্যা নাই, বাঙালি সম্প্রদায়ের মতো আলাদা করে কেন বলতে হচ্ছে, আমরা আসলে জাতিগত বিভাজন করছি কিনা--এই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে আলাদা করে বলা মানে আলাদা করে ফেলা নয়। আলাদা করে বলার মানে যাতে সেটার একটা পরিপূর্ণ গঠনের মধ্য দিয়ে একটা কাঠামোগত অন্তর্ভুক্তি (স্টাকচারাল ইনক্লুশন) ঘটে। এই অন্তর্ভুক্তির জন্যই আলাদা করে বলা। বর্জন (এক্সক্লুশন) আছে বলেই তো অন্তর্ভুক্তির কথাগুলো বলতে হয়।
আমি শুরুতে কিছু কেস স্টাডি দিয়ে বুঝাতে চাই যে আদিবাসীর নারীর সংগ্রামের ভিন্নতা কোথায়। ২০১৭ সালের ঘটনা, আমি জানি না আপনাদের এখনো মনে আছে কিনা, থানচি’র দুজন নারী ধর্ষণের শিকার হন। এই ধর্ষণের সাথে জড়িত ছিলেন ওখানকার নিরাপত্তা প্রদানকারী বাহিনীর সদস্য। ঘটনাটি মিডিয়ায় বেশ গুরুত্ব পায়। কারণ এটার সাথে অনেক আদিবাসী অধিকারকর্মী যুক্ত ছিলেন, তারা এটার জন্য কাজ করেছেন। সে কারণে এটা আন্তর্জাতিক নানান প্রচারণার মধ্যে আসে। এরপর অনেক ঘটনা ঘটলো। যারা সেই নারী দুজনের বিচারের জন্য কাজ করেছিলেন, তাদের উপরে হামলা করা হয়। পরবর্তীতে সেই দুজন নারী কোথায় আছেন আমরা জানি না।
এটা গেল একটা। এরপরে আমি ম্রো সম্প্রদায়ের একটা দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রামের কথা বলতে চাই। আমার একজন নারীর সাথে পরিচয় হয়, তিনি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করে অনেক দূর এসেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম যে, সংগ্রাম করে এই পর্যায়ে আসার প্রেরণা তিনি কীভাবে পেলেন, লড়াই করার সাহস কোথায় পেলেন। তিনি বলছিলেন, তাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত যে ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়, এই বিষয়গুলো তাকে অণুপ্রাণিত করেছে। তিনি জানে এই সহিংসতার সাথে লড়াই করতে হলে তাকে কাঠামোগত যে বৈষম্য আছে, সেখান থেকে বের হতে হবে। তার মনে হয়েছিল এই বৈষম্য থেকে বের হওয়ার একমাত্র অবলম্বন শিক্ষা।
আদিবাসী নারীদের নিত্যদিনের সংগ্রামগুলো কি আপনারা জানেন? আদিবাসীদের যে জীবনযাপন এবং জীবনযাত্রার অবস্থা প্রথমত তা আমাকে দিয়ে আদিবাসীর জীবন বুঝতে যাবেন না। এটার মধ্যে অনেক ইন্টারসেকশনাল আইডেন্টিটি রয়েছে। আমার নামের সাথে একটা চাকমা লেজ আছে এবং এই চাকমা একটা সম্প্রদায় হিসেবে আমাকে কিছু সুবিধা দিয়েছে। এটা বাংলাদেশের যত আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে, তার মধ্যে চাকমা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সংখ্যাগরিষ্ঠরা তো কিছু সুবিধা পায়, এটার একটা ইতিহাস তো আছে। কে কীভাবে সুবিধাটা আগে পেয়েছে, কে কীভাবে পরে পেয়েছে এবং কে আসলে বিতাড়িত (এক্সক্লুড) হয়েছে, এটার একটা ইতিহাস আছে।
আজকে যারা প্রান্তিক আদিবাসী, যারা জুম চাষ করেন, মূলধারার যে ভূমির (সোল্ড মেইনস্ট্রিমের যে ল্যান্ডের) ধারণা, সেই ভূমির ধারণা তাদের নাই। রাষ্ট্র যখন গঠিত হলো, আদিবাসীদের ভূমি সম্পর্কে যে দর্শন-জ্ঞানচর্চা, সেটাকে আমলে না নিয়েই একেবারে ভিন্ন একটা জাতিকে--যাদের সাথে আমাদের একদম ভিন্নতা আছে--সেরকম মানুষকে ওখানে জোরপূর্বক বসানো হলো। পারস্পরিক বোঝাপড়াটা (নেগোসিয়েশনটা) তো ছিল না, তো কি হলো? ম্রো সম্প্রদায়ের নারীর মুখে শুনেছিলাম বিষয়টি। খুবই প্রান্তিক একটা গ্রাম থেকে তিনি উঠে এসেছেন, যেখানে তাকে বাস থেকে নেমে অনেকটুকু হেঁটে যেতে হয়। তিনি বলছিলেন যে, আমাদের মেয়েরা বন-জঙ্গল থেকে ফলমূল, এটা ওটা নিয়ে আসে। এখন আমরা ওটা পারি না কারণ ওখানে প্রায়শ বসতি স্থাপনকারী (স্যাটলার) যারা আছেন—( আশা করি, আপনাদের বসতি স্থাপনকারী (স্যাটলার) শব্দে আপত্তি নাই--কারণ আমরা সেপ্টেম্বর অক্টোবরের পর দেখতে পাচ্ছি যে সমতলের যারা আছেন তারাও এই শব্দটাকে খুব নিজের করে (ওন করছেন) নিচ্ছেন) সেসব নারীরা যখন গাছপালা বা সবজি আনতে জঙ্গলে যায়, ওখানকার বসতি স্থাপনকারী বাঙালি পুরুষদের দ্বারা প্রায়শ ধর্ষণের শিকার হন।তিনি বললেন যে, সেই নারীদের এরপরে কখনো বিয়ে হয় না, আবার বিয়ে হলেও তাদেরকে প্রতিবন্ধী পুরুষদের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। অথবা মেয়েগুলো পালিয়ে চলে যায়। এখন বিচারটা কেন হয় না? তারপর তিনি উদাহরণ দিলেন তাদের পাশের বাসার এক পরিবারের কথা, মেয়ে এরকম ধর্ষণের শিকার হলে এক ভদ্রলোক পুলিশের কাছে যায়। পুলিশ তাকে মারধর করে বের করে দেয়, মামলা নেয়নি । সেই নারী আমাকে জানান যে, এই ধর্ষণের ঘটনা ওখানে খুবই সচরাচর হয়।
আমরা হয়তো ফেসবুকের কল্যাণে আজকাল--মূলধারার গণমাধ্যমের কথা তো বাদই দিলাম-- দুই একটা ঘটনার কথা শুনতে পাই। কিন্তু কোনো ঘটনা যখন সামনে আসে, সেটাও তো আসলে অনেকগুলো পর্ব অতিক্রম করে আসে। ভুক্তভোগীর মধ্যে যদি সচেতনতা থাকে, তার মধ্যে যদি সাহসটা থাকে, তাহলে হয়তো পারিবারিক, সামাজিক বাঁধাগুলো ভেঙে সে কোনো মানবাধিকার কর্মীর কাছে পৌঁছাতে পারে। সেগুলোকে মোকাবেলা করে আসলে কতজনের পক্ষে সম্ভব হয় এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার। তার উপর সেখানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি অত্যন্ত প্রকট। এটা এখানকার মতো না।
আরেকটা কেস, প্রথমটা হচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা আগ্রাসন, দ্বিতীয়টা, ওখানে যারা সেটলার আছেন তাদের আগ্রাসন। তৃতীয়ত, পর্যটন কেন্দ্রিক আগ্রাসন। আমরা পর্যটন নিয়ে একটা কাজ করছি। পর্যটন কেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি যেসব সম্প্রদায় আছে, আমরা তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। নারীদের কাছে আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, পর্যটকদের কারণে আপনারা কোনো হয়রানির শিকার হন কিনা? তারা প্রত্যেকেই বলেছেন যে, পর্যটকরা কোনো না কোনোভাবে তাদের সাথে এমন আচরণ করে থাকে, যেটা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলছে। আপনারা জানেন, আদিবাসী নারীরা একটু স্বাধীনভাবে বিচরণ করে। আমি স্বাধীনভাবে বিচরণ মানে মানসিকতার কথা বলছি না, আমি বলছি চলাফেরার (মোবিলিটির) কথা। আমরা এখন একটা পরিবারের কাঠামোর মধ্যে আছি, সেখানে একটা উঠান থাকে। কিন্তু গ্রামে তো ব্যাপারটা ভিন্ন, গ্রামের সীমানা নাই। আদিবাসী নারীদের চলাফেরার (মোবিলিটির) বিস্তারের যে পরিধি, যারা কিনা পর্যটক হিসেবে সেখানে যাচ্ছেন তাদের যে নজরদারি, শুধুমাত্র নজরদারি না তাদের যে একটা অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি, সেই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সেখানকার নারীদের চলাফেরা অনেক সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে (মোবিলিটি অনেক রেস্ট্রিক্টেড)। যখন কাজের জন্য বাইরে যাচ্ছেন, পরিবার থেকে এক ধরনের একটা চাপ তৈরি করা হয়--না এতদূর যাওয়ার দরকার নাই। পোশাক নিয়ে তাদের নানা রকম মন্তব্য শুনতে হয়। আপনারা জানেন কিনা জানি না বা আপনারা পার্বত্য চট্টগ্রামে গেছেন কিনা। ম্রো সম্প্রদায়ের নারীদের আগে পোশাক ছিল হাঁটু পর্যন্ত, এটা কোনো সমস্যাই ছিল না। কিন্তু এখন যখন পর্যটকরা ওখানে যাচ্ছেন, যত্রতত্র কোনো অনুমতি ছাড়া ছবি তুলছেন, --তার ফলস্বরূপ তাদের পোশাক এখন লম্বা হয়ে গেছে। এগুলো হচ্ছে এর প্রভাব বা ফলাফল, এই সহিংসতা নারীদের চলাফেলা সীমিত করে দিচ্ছে।
এই যে কয়েকটা কেস স্টাডি আমি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম--এগুলোর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে কিনা আমি জানি না-- যে তথাকথিত মূলধারার বাঙালি নারীদের সহিংসতার ধরণ থেকে আদিবাসী নারীদের সহিংসতার ধরনটা ভিন্ন। তাহলে সমাধান কী? সমাধান তো তখনই আসবে, যখন কিনা আমি আলোচনার টেবিলে থাকব। আমি আপনার টেবিলে নাই, আমাকে বলা হচ্ছে আমি নাই, তখন তো আসলে আমার কথা আসবেও না। একদিকে তো আপনারা জানেন যে বাংলাদেশের সংবিধানে একদম অস্বীকার করা হয়েছে। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার কথা এখন আমরা খুব শুনছি এবং এগুলো নিয়ে কাজ হচ্ছে। কিন্তু জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার রিপোর্টগুলো আপনারা যদি দেখেন, খুবই (ডিসেগ্রিগেটেড) উপাত্ত—একদমই সহিংসতা ওখানে নেই। গত কয়েকদিন আগেই বিবিএস এর একটা রিপোর্ট বের হলো জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার। এটা হচ্ছে ২০২৫ সালের। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নারীদের ওপর কি কি ধরনের সহিংসতা হয়েছে, সেটা নিয়ে। তবে সহিংসতার ধারণা অনেক সীমাবদ্ধ সেখানে, সহিংসতাকে তারা সংজ্ঞায়িত করেছে যৌন সহিংসতা, তারপরে পারিবারিক সহিংসতা (ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স), সেখানে আবার সঙ্গীর দ্বারা যৌন সহিংসতার ঘটনা। কিন্তু আদিবাসীসহ আরো অন্যান্য যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা ঐ পরিচয়ের লোকজন আছেন, তাদের সহিংসতার ধরনটা তো ভিন্ন, তাদের সহিংতার কথাগুলো তাহলে কোথায়? বাংলাদেশ হোক, গত ফ্যাসিস্ট শাসনামল হোক বা যেটাই হোক বাংলাদেশ জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নিরসনে একটা আন্তর্জাতিক একটা ভালো অবস্থান নিচ্ছে বলে মাঝখানে আমরা শুনতে পেয়েছি। কিন্তু যেখানে বিভিন্ন ধরনের সমাজের মধ্যে যে বিভিন্ন অবকাঠামোগুলো (স্ট্রাকচারগুলো) আছে, সেখানে আরো ভিন্ন ধরনের পরিচয়ের মানুষের ওপরে, নারীদের ওপরে যে সহিংসতাগুলো বিরাজমান, সেগুলো যখন অবহেলা করা হচ্ছে বা দেখাই হচ্ছে না, তখন এটা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। এটা অন্তর্ভুক্ত করতে নানান ধরনের সংস্থা হতে বর্তমানে কথা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এগুলার জন্য চাপ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমি জানি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো এই মিলনরেখার আতশকাচ দিয়ে (ইন্টারসেকশনাল লেন্স) দেখার জন্য কতটা প্রস্তুত। গতবার বিবিএস এর একজনের কাছে একটা প্রোগ্রামে আমি প্রশ্ন করেছিলাম যে, আদিবাসী (ইন্ডিজেনাস) নারীদের উপরে যে সহিংসতা হয় সেগুলোকে তুলে ধরতে আপনারা কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন কিনা? তিনি বলছিলেন যে, তারা বিবিএস হতে সামনে একটা কাজ করবেন, বাংলাদেশে আদিবাসী জনসংখ্যা কতজন এবং তাদের কতটি ভাষা আছে, তাদের বর্ণমালা-- এসব নিয়ে। এটা খুবই দুঃখজনক যে, আজকে স্বাধীনতার এত বছর হয়ে গেছে কিন্তু আদিবাসী ভাষা, জনসংখ্যা নিয়ে কাজ মাত্র শুরু হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যে কাঠামোগত সহিংসতাগুলো আছে, সেগুলো তো প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেপ্টেম্বর অক্টোবরে যখন চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলে (হিল ট্রেডসে) সহিংসতা শুরু হলো, আপনারা হয়তো সবাই জানেন। আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপরে সহিংসতা শুরু হওয়ার পরে মূলধারার মধ্যকার আদিবাসী সমাজের যে চিন্তাগুলো আছে, সেই জিনিসগুলো বুঝতে আমাদেরকে সাহায্য করেছে। আরিফ খান বলছিলেন যে, আমরা এখন যে সমস্যাগুলো দেখতে পাচ্ছি এগুলোর একটা হয়তো ভালো দিক হচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি কোথায় শূন্যতা আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, আমরা যখন চট্টগ্রাম নিয়ে কথা বলছিলাম, সেই সাথে আমরা মূলধারার যারা অ্যাক্টিভিস্ট আছি, তাদের কাছে আমরা প্রত্যাশা রাখছিলাম এগুলোর ব্যাপারে কথা বলতে। আমরা কিছু জিনিস খেয়াল করলাম, প্রথমত, কেউ কেউ সেই পুরনো বয়ানে ফিরে গেলেন এটা বলে যে, বাইরে থেকে ইন্ধন আছে-- আরেকটা বয়ান হচ্ছে নীরবতা (সাইলেন্স)।
আপনারা জানেন যে, ৫ আগস্টের পরে চট্টগ্রামের পাহাড়ে অনেকগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। আমরা এগুলো নিয়ে যখন কথা বলেছিলাম বেশিরভাগ মানুষই চুপচাপ ছিল। আমি অনেককে বলেছিলাম যে, চেতনা থেকে এই সহিংসতাগুলোকে অবহেলা করা হচ্ছে কিংবা ন্যায্যতা দেওয়া হচ্ছে। ঠিক একই ঘটনা যখন নিজের ঘরে চলে আসবে তখন করার কিছু থাকবে না। আমরা যারা নিজেদের অধিকারের জন্য বা মানুষের অধিকারের জন্য কথা বলছি, আমাদের এই ঐক্যটা থাকা খুব জরুরি। কীভাবে সবগুলো সংকট একটা আরেকটার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং তা কীভাবে ঘটছে। আমরা একসাথে কাজ করতে পারি এবং একসাথে কাজ করতে গেলে আমাদের এমনটা ভাবা উচিত হবে না যে, আজকে নারী আন্দোলনের জন্য যে নীতিগুলো নেওয়া হবে, সেই নীতিতে বাংলাদেশের সকল নারীর সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ব্যাপারটা ঠিক ওরকম না।
প্রত্যেকটা আদিবাসী নারীদের যে কাঠামোগত সহিংসতাগুলো আছে, সেগুলোকে তুলে ধরতে আলাদা নীতিমালার দরকার আছে। স্বতন্ত্র যে সংস্থা আছে তাদের এ বিষয়ে আলাদা করে কাজ করতে হবে। এই আলাদাভাবে করা দরকার কারণ না হলো--আমরা তো কথা বলছি সমতা নিয়ে—এটা তো অনেক পরের ব্যাপার, আগে তো জীবনে বেঁচে থাকতে হবে। তারপর আমি সমতার কথা বলব। আমরা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ যখন একটা টিকে থাকার লড়াইয়ে (সারভাইভাল মোডে) আছি, তখন আমাদেরকে সমতার কথা বলে লাভ নাই। জীবন নিয়ে পালানো মানুষের কাছে সমতার কথা বলা যায় না। আগে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপত্তার ব্যবস্থা তখনই হবে যখন স্বীকৃতি থাকবে। স্বীকৃতি দিতে হবে যে বাংলাদেশে ইন্ডিজেনাস আছে, ইন্ডিজেনাস হোক আদিবাসী, উপজাতি যে শব্দে হোক না কেন-- এটা তো মানতে হবে যে মূলধারার যে বাঙালি সম্প্রদায় আছে তাদের থেকে আদিবাসীদের জীবনাচরণ ভিন্ন। তাহলে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের যে সীমা, সেই সীমার মধ্যে যখন ভিন্ন ভিন্ন জীবনাচরণের মানুষ একসাথে থাকা শুরু করল, এই মানুষগুলোকে কীভাবে একত্র করা যায়, তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে এখন কোন পদক্ষেপ নিতে হবে—এটা আমাদের ভাবতে হবে। আবার কেউ হয়তো মনে করতে পারে যে, তারা তো সংখ্যা কম, তাই তাদেরকে অবহেলা (ওভারলুক) করলেও চলে। কিন্তু গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত (ডেমোক্রেসির ফান্ডামেন্টাল রিকোয়ারমেন্টটা) তো এটাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে যে অরক্ষিত (ভালনারেবল) সে তার মৌলিক অধিকার পাচ্ছে কিনা। তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে নাকি নাই, সেটা পরিমাপ করতে হলে তথাকথিত মূলধারার সুবিধার ( প্রিভিলেজ বলি যে কন্ডিশন গুলো আছে) বাইরে আমরা যারা আছি, তাদের নিয়েই পরিমাপ করা যাবে। বাংলাদেশের যে নীতি প্রণয়নের (পলিসি এডভোকেসির) কথাগুলো বলছিলাম, খুবই হাস্যকরভাবে তা হচ্ছে। আইএলও- এর ১০২ ধারা যেটা ছিল সেটার সাথে তারা একমত, কিন্তু পরবর্তীতে ১৬৯ যে নীতি করে সেটার সাথে বাংলাদেশে একমত হয় নাই। কারণ সেটার জন্য যে নিরাপত্তাটা দেওয়া দরকার, বাংলাদেশ সেটার জন্য প্রস্তুত না। এটার সাথে ভূমি সম্পর্ক জড়িত। এখন কথা হচ্ছে, ভূমি সমস্যার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যে ব্যবস্থা নিচ্ছে অর্থাৎ ভূমি ছাড়াই যার আদিবাসী দরকার, কারণ ওখানে পর্যটন চালানো যাবে, আমার চমৎকার চমৎকার পোশাক পড়িয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে নাচ গান করানো যাবে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে ভূমি ছাড়া তো আসলে আমি আদিবাসী হতে পারব না। তো এই পার্থক্যটা একটা রাষ্ট্র কীভাবে দেখতে চায়, এই প্রশ্নটা আসলে যারা মূলধারার জনগোষ্ঠীর মানুষ আছেন আপনাদেরকে করতে হবে। কারণ আগস্টের সময় আমরা অনেক আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম, দেখেছিলাম মূলধারার সম্প্রদায় যদি আমাদের কথা বলে সেই কণ্ঠস্বরটা অনেক জোরালো হয়। যে কথাগুলো আমাদের পূর্বসূরিরা গত ৪০/৫০ বছর ধরে বলে আসছে তা সমতলে পৌঁছায়নি, গণমাধ্যমে কখনো এগুলো উঠে আসে নাই। কিন্তু সেই কথাগুলো আমরা দেখলাম যে আগস্টের সময়, জুলাইয়ের সময় যখন আন্দোলনের সাথে যুক্ত সামনের সারির মানুষগুলো বললেন, আমরা বুঝতে পারলাম যে, আমাদেরকে নিয়ে মানুষ অনেক ভালো কথা বলছে, তারা আমাদের অধিকারের দাবিকে সমর্থন জানাচ্ছে। বুঝতে পারলাম যে, আমাদের কথা শুধু আমরা বললেই হয় না। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা আছে--গণতন্ত্রের এটা আরেকটা শর্ত যে সংখ্যাগরিষ্ঠকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হয়। সে আচরণটা কেমন হবে, কীভাবে তাদেরকে দায়বদ্ধ করা যায়, সেটা নিয়ে হয়তো আমাদেরকে অনেক কথা বলতে হবে। এই ধরনের আরো আলাদা আলাদা প্রোগ্রাম করতে হবে। তা না হলে বৈষম্যের যে বিভিন্ন ধরণ, আলাদা আলাদা রূপ, সেগুলোকে উন্মোচন (এড্রেস) করা যাবে না। আমি জানি, আমরা এখন খুব কঠিন সময় পার করছি এবং কঠিন সময়ে আশার বাণী পাওয়া যায় না এবং আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু এটা তো ঠিক যে বিপ্লবের পথ একদিনের না, এটা আমাদেরকে ৫ই আগস্ট বুঝিয়ে দিয়েছে এবং বাংলাদেশ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত না। এটা হচ্ছে সত্য, খারাপ লাগলেও এটাই সত্য।