
২৯১ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
বিষয়: আমার জীবনানন্দ
বক্তা: পিয়াস মজিদ
তারিখ: ১২ জানুয়ারি, ২০১৮
রবীন্দ্রনাথের কাছে সে ‘চিত্ররূপময়’। বুদ্ধদেব বসুর কাছে নির্জনতম কবি। আবদুল মান্নান সৈয়দের কাছে শুদ্ধতম কবি। অম্বুজ বসুর কাছে ‘নক্ষত্রপ্রতিম’। আমার জীবনানন্দ সকল সংজ্ঞাতিক্রমি।
চিত্র নির্মাণ করে পরক্ষণেই চিত্রের ঘেরাটোপ ভেঙে যে এক সারিতে দাঁড় করায় রূপসনাতন আর অরূপরতনকে, তাকে কি কেবল চিত্ররূপময় অভিধাভুক্ত করে রাখা যায়? আমি তো তার কবিতায় শুনি ইতিহাস-ভূগোলের আবহমান কাকলি। তবে তাকে ‘নির্জনতম’ বলি কেমনে? আমি তো তার কবিতায় শুদ্ধ কল্পনা আর চূড়ান্ত বাস্তবের ভেদ লুপ্ত হতে দেখি। তাই তাকে ‘শুদ্ধতম’ সম্বোধনে খন্ডিত মনে হয়। আমি তো তার কবিতায় জ্যোতির পাশাপাশি দেখি তমসের দীপ্তি। তাই তাকে নক্ষত্রের সীমানায় বাঁধতে পারি না। এমনই আমার জীবনানন্দ। কলকাতায় বা
বরিশালে বসে চৈতন্যে ধারণক্ষম বেবিলন, লিবিয়া কিংবা সিংহল। মাটিতে বসে অনুভব করে যে নক্ষত্রের আয়ুক্ষয়। তার কবিতায় তারার পাশে চুপচাপ শুয়ে থাকে তিমির। বেলার পিছে দাঁড়িয়ে থাকে কালবেলা। জ্যোৎস্নার ভেতর সবাই ভূত দেখে না। যে দেখে সে-ই জীবনানন্দ। পৃথিবীতে যার নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকুরি সে-ই জীবনানন্দ। যখন সবাই স্বর্গের স্বপ্নে বিভোর তখন যে নরকের নবজাতে মেঘের দিকে যাত্রা করে সে-ই জীবনানন্দ। জীবনের রাত্রিভোর কারুবাসনা যাঁর সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দেয় সে-ই জীবনানন্দ, ট্রামনিয়তি গ্রহণ করে যে শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালে ধুঁকে ধুঁকে মরে যায় সে-ই জীবনানন্দ। পৃথিবীতে ঢের শালিকের ভিড়ে যে জনমভর অজ্ঞাত তিনটি শালিক খুঁজে ফেরে সে-ই জীবনানন্দ। চারদিকে কত মাছের কাঁটার সফলতা! কত সোনাদানা! এর কোথাও আমার জীবনানন্দকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ নিদ্রার ভেতর সংঘারাম জেগে থাকলে যে যুগপৎ বর্তমান ও আটবছর আগের কোনো একদিনে বিচরণ করে একমাত্র সে-ই জীবনানন্দ। অর্থ কীর্তি কিংবা সচ্ছলতা নয় বিপন্ন বিস্ময়ের সূত্র জানা যার সে-ই জীবনানন্দ। আমার জীবনানন্দ জগতের যাবতীয় সুতীর্থে খাপ না খাওয়া এক করুণ মাল্যবান মাত্র।
এইখানে সরোজিনী শুয়ে থাকে। এইখানে সরোজিনী শুয়ে থাকে না। মহাপৃথিবীর এইসব দিনরাত্রিতে আমাদের যে অধিবাস তাতে সবারই অন্বিষ্ট জিজ্ঞাসার স্থির উত্তর। কিন্তু জীবন তো এই ছকের চুরমার। জীবন এক অমীমাংসিত সরোজিনী যেন। যার অস্তিত্ব একই সঙ্গে জাগ্রত ও বিলীন। বাংলা কবিতা যখন অন্ধকারভেদী ‘আলো, এতো আলো’তে নিমজ্জিত তখন জীবনানন্দ দাশের করতল থেকে বেরিয়ে এলেন সরোজিনী দেবী। তিনি শেখালেন জোর করে আলো আনা যায় না। মানুষমনের তমস-পরিসর চাইলেই গুঁড়িয়ে ফেলা যায় না। বরং সংশয়ী হাওয়া এসে সাজানো বাগান এলোমেলো করে দেয়। তখন বিষম ধন্দে পড়ে যাই। এই সরোজিনীকে দেখি তো এই দেখি না। অবচেতনা বলে একে উপেক্ষা করাও নিরর্থ। কেননা এর মতো খাঁটি চেতনা আর কিছু হয় না। চেতনা তো আর অশ্বডিম্ব নয়; আমার মনোলোকেরই প্রতিভাস সে। সুতরাং সরোজিনীর শয়ন-পরিস্থিতিই এখন আমার চেতনা।
জীবনানন্দের পূর্বের কোনো কবি আঁকলে নিশ্চিত সরোজিনীকে আঁকতেন পরি হিসেবে। কিন্তু জীবনানন্দের বলেই সরোজিনী মানুষী। জীবনানন্দের বলেই সরোজিনী ফাঁপা মুক্তির গান গায় না। জীবনানন্দের বলেই সরোজিনী আমাকে এমন সত্যের মুখোমুখি করে যে, দুঃসহ দেবতাজন্মের হাত থেকে বেঁচে গেছি আমি। নিতান্ত মানুষজন্ম আমার। দেব হলে জেনে যেতাম এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে কি না। সব রহস্য তো শেষ হয়ে যেতো তৎক্ষণাৎ। কিন্তু দেবতা না, রক্তমাংসের এক মানুষ বলে আমি জানি আবার জানিও না সরোজিনী ঠিক কোথায়। আর এই ধাঁধাটি আছে বলেই তো রহস্যের রেশমি গিঁট খোলার অপেক্ষায় বেঁচে থাকি।
এইমতো আমার জীবনানন্দ...এইমতো আমার জীবনবেদনা।