
২৮৯ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
বিষয়: বাঙালি মুসলমানের মনের মামলা
বক্তা: ফারুক ওয়াসিফ
তারিখ: ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭
বাঙালি জাতির সোনার ইতিহাসের মধ্যে মুসলমানি একটা সমস্যা। বাঙালিত্ব আর মুসলমানি এক হয় কীভাবে? কারণ মুসলমান হয়ে পাকিস্তানি করা সত্ত্বেও বাঙালি হতে চাও কেন? কিন্তু বাঙালি পরিচয় ঐতিহাসিক অধিকার। যা কিছু বাঙালি তা আমারও। পাকিস্তানিরা আমাদের কাছে বিপরীতভাবে এ প্রশ্ন এনেছিল। তারা বলেছে , তুমি বাঙালি হলে মুসলমান থাকতে পারবে না। তাদের কার্যক্রমে মনে হয়েছে মুসলমান ও বাঙালি দুটো আলাদা জাতি। আহমদ ছফার “ বাঙালি মুসলমানের মনে ” সূক্ষ্মভাবে বাঙালি মুসলমান হতে পারেনি তার কথা বলা আছে। বাঙালি জাতির সোনার ইতিহাসের মধ্যে মুসলমানিও একটা সমস্যা। সে ভুল করে বাঙালি হয়ে নিজেকে সংশোধন করে নিল। তবে এর জন্য তাকে অবিরত পরীক্ষা দিয়ে যেতে হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িকতা , সেকুলারিজিমসহ , দেশভাগের দায় কার—এর জন্য তাকে অবিরত পরীক্ষা দিয়ে যেতে হচ্ছে। এই সমস্যার মধ্যে বাঙালি মুসলমানের অন্তর্গত, মজ্জাগত, অপরিহার্য একটা লক্ষণ আছে । যার কারণে তার এ অস্থিরতা ।
যে বাঙালি সমাজের অতীতে রাষ্ট্র যন্ত্র পরিচালনার কোন অভিজ্ঞতা নেই। সে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করল। এই সৃষ্টিতত্ত্বটা কোথায়? আহমদ ছফার “বাঙালি মুসলমানের মন” বইয়ে ১৯৬০ সালে স্বাধিকার আদায়ের কৃতিত্ব, অসাম্প্রদায়িকতার কর্ম কার— এ সম্পর্কে আহমদ ছফা কিছু বলেন নাই। সেরকম কোন আপ্তবাক্য বা সাফাইয়ের পক্ষে আহমদ ছফা কোন যুক্তি দেন নাই। তার সিদ্ধান্তের পেছনে কোন কার্যকারণ দেখা যাচ্ছে না। এই বইয়ের বেশির ভাগ আলোচনা সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক আলোচনায় টিকবে না।
কলকাতার মধ্যে ইংরেজ প্রভাবিত যে আলো দেখা যায়, মুসলমানদের মধ্যে সে আলো অনুপস্থিত। কারণ তাদের নিজস্ব সাহিত্য রচনার পদ্ধতিগুলো -- পুথি বলি-- স্বভাষায় লেখা সাহিত্যর মধ্যে দিয়ে তারা কিন্তু একে সংরক্ষণ করেছে। এই সংরক্ষণের আকাঙ্খাকে দীনেশচন্দ্র সেন বলছেন , জাতীয় মানস গঠনের উপাদান। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও বলেন , যদি এগুলো না থাকত তাহলে আমরা একটা আত্মবিস্মৃত জাতিতে পরিণত হতাম। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলাদেশে ইসলাম একটা অসঙ্গতির মতো। বাঙালি যখন জাভায় যাচ্ছে তখন তা আরো বেশি অসঙ্গতিপূর্ণ। বাঙালি যখন ইন্দোনেশিয়ায় যাচ্ছে, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তার ঠিকমতো যোগসাজেশ হচ্ছে না।
একটা সমাজের মানুষ ইসলামকে কিভাবে নিবে, এই ক্ষমতা সে সমাজের মানুষের আছে। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের মধ্যে আতরাফ, পুথি সাহিত্যের মানুষরা আসতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে মৌলবাদীদের বিশ্বাসকে আরো শক্তিশালী করা হয়। তারা ফরায়েজী আন্দোলনের সময় বলেছিল, তোমরা যথার্থ মুসলমান না । তোমরা ইসলামের মৌলিক ধারায় আস না। সেজন্য আজকে যারা যথার্থ মুসলমান, পিউর ইসলাম নামে যে ধারাগুলো আমরা দেখি। তারাও বলছে. তুমি স্থানীয় মুসলমান, তুমি খাঁটি মুসলমান না। তুমি না বাঙালি, না মুসলমান।
বাঙালিদের মধ্যে একটা মিলনাত্মক দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল আছে। তার প্রমাণ বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী এই কৃষক সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। মুসলমান শাসনামলে বাংলা ভাষার চর্চাটা পৃষ্ঠপোষকতা পায়। আজকে আমরা যে বাংলা ভাষায় কথা বলি তা মূলত ঐ সময় থেকে যাত্রা করা।
একটি জাতি যখন মুক্ত পরিবেশ পায়, তখন অন্যান্য ধারার পাশাপাশি তার মধ্যে অন্যান্য ধ্যান - ধারণাগুলো সম্পর্কেও বদলের একটা ঘটনা ঘটে। বাঙালি মুসলামানের ঐতিহাসিক যাত্রা দেখি , তখনও সে বঙ্গীয় রেঁনেসা করছে । বাঙালি উপমহাদেশে একটা প্রগতিশীল, শ্রেণিভিত্তিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটছে। সুতরাং বলা যায়, উপমহাদেশের প্রথম প্রগতিশীল শ্রেণিভিত্তিক আন্দোলন হচ্ছে কৃষক-প্রজা পার্টির আন্দোলন। সেই আন্দোলন ভাষা আন্দোলন ঘটাচ্ছে। এই ভাষা আন্দোলন একাত্তর পর্যন্ত আসছে। এই পুরো বিষয়কে যেভাবে অভিহিত করা হয় মনে হয় এটি একটি সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা।
আহমদ ছফার মতে বাঙালিতে কোন মনীষা শ্রেণি নেই। তার এ কথা ঠিক কারণ আমরা আতরাফ শ্রেণি থেকে এসেছি। কিছু সেসময় উর্দুভাষীরা আশরাফ শ্রেণি ছিল। এই কথাটা একদিক থেকে ঠিক। কিন্তু এরা শুধুমাত্র জমিদারি ব্যবস্থার শোষণে ছিল না , মুসলমান বা সুলতানি শাসনামলে যে দাতব্য ওয়াকফ প্রতিষ্ঠাগুলি ছিল। ইংরেজরা তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলেছিল। এমনকি বাংলার সেচ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলেছিল। রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক , সামাজিক ঘটনাবলি আমলে না নিয়ে আমি যদি আলোচনা করি ঐ সময় বাঙালি মুসলমান ইংরেজি শিখতে কেন যায় নি , কেন তারা সাহিত্য কর্ম করতে যায় নি । তাহলে এ আলোচনা হয় ক্ষতিগ্রস্থকারীকেই দোষারোপ করা। এই আলোচনা করা যায় কিনা যে মুসলমান বলে বাঙালি বলে কোন স্থির জিনিস হাজার হাজার বছর টিকে ছিল কিনা।
ফলে বাঙালি মুসলমানকে কোন স্থির জিনিস দিয়ে আটকে রাখা, যদি পিনটাকে আমরা সরাইয়া ফেলি তাহলে দেখতে পাব বাঙালি মুসলামানের অভিযোগের পুরো ভিত্তিটাই ধসে পরে। একই অভিযোগ বাঙালি হিন্দুর প্রতিও করা যেতে পারে।
বাঙালির সঙ্গে মুসলমান থাকলে সে কম বাঙালি হয় ,হিন্দুর সঙ্গে বাঙালি থাকলে সে কি বেশি বাঙালি হয়? বাঙালি কি কোন আইডোলজিকাল পরিচয়, আমি বাংলায় কথা বলি, আমি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করি , আর মোটা দাগে ইতিহাস ঐতিহ্যকে আমার বলে মনে করি । তাহলেই আমি বাঙালি । তাহলে আদমশুমারির সময় বাঙালি ও মুসলমানকে আলাদা করার চেষ্টা করা হচ্ছে কেন? কারণ বাঙালিকে ভাবা হচ্ছে একটা আইডোলজিকাল পরিচয়, পাওয়া যাচ্ছে একটা উচ্চবর্ণেও হিন্দুত্বের ধারণা যা বর্তমানে আরো প্রবল হচ্ছে । ফলে মুসলমানের সঙ্গে তার একটা বৈসাদৃশ্য হবেই।