
২৮৮ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
বিষয়: দেশভাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বক্তা: রাশেদ রাহম
তারিখ: ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭
১৯২১ সালে উপমহাদেশের প্রথম আবাসিক ও শিক্ষাদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম তিন দশকের খ্যাতি সীমাবদ্ধ ছিল প্রধানত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। কিন্তু দেশভাগের পর উচ্চ-বিদ্যায়তনের পাশাপাশি তা হয়ে উঠে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের আঁতুড়ঘর। এ হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের কালানুক্রমিক ও একরৈখিক পাঠ। কিন্তু দেশভাগ তো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া-মাত্র নয়। তা আমাদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-মানসিক পরিসরেও দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিনিধত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর দেশভাগের প্রভাব ছিল প্রত্যক্ষ ও সুদূরপ্রসারী। কিন্তু ইতিহাসের কালানুক্রমিক পাঠ তা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞান ও অচেতন করে রাখে। এই পরিস্থিতিকেই অনন্যা জাহানারা কবির তার সাম্প্রতিক গবেষণায় বর্ণনা করেছেন ` Partition’s Post-amnesia” হিসেবে।
দেশভাগের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো, জনমিতিক বৈশিষ্ট্য, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যাপক রূপান্তর ঘটে। দেশভাগের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ যে অভিঘাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণা সংস্কৃতিকে হঠাৎ পঙ্গু করে তোলে তা হল হিন্দু শিক্ষকদের দেশত্যাগ। অল্প বেতন, পাকিস্তানে অবসরের বয়স যেখানে ৫৫ ভারতে সেখানে ৬০ বছর—এই সব বিবেচনা কাজ করেছে তা স্বীকার্য, কিন্তু প্রধান কারণ ছিল মুসলমানদের রাষ্ট্রে হিন্দুদের অনিরাপত্তা। উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তখন প্রচার করছে ইসলামী রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি। বিদেশি শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পাশ করা শিক্ষার্থীদের নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষক সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিল হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু ১৯৪৭ সালেই জগন্নাথ ও ঢাকা হল ফাঁকা হয়ে যেতে শুরু করে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায় ব্যাপক হারে, যার অধিকাংশই মুসলমান, স্থানীয় এবং শরণার্থী। কৃষিপ্রধান পূর্ববঙ্গের পশ্চাৎপদ মুসলমানদের জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার অবারিত হয়, মুসলমানদের মধ্যে নারীশিক্ষা প্রণোদনা লাভ করে। ১৯৪৬-৪৭ সালে ছাত্রী সংখ্যা ৭২ জন থেকে ১৯৪৭-৪৮ সালে দাঁড়ায় ১০০ জন। শিক্ষার্থী সংখ্যার এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফলে ভর্তি প্রক্রিয়া শিথিল হয়ে পড়ে, শিক্ষার্থীর মান নিম্নগামী হয়। এর সাথে যোগ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো আবাসিক ভবন সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত। ফলে তীব্র আবাসন সংকট সৃষ্টি হয়। এদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা পূর্ববঙ্গের ৫৫টি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ব্যাপক রদল-বদল করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমশ একটি বিশাল প্রশাসনিক যন্ত্র, বড়জোর শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক শাসনে রাজনৈতিক পরিধি ছিল সংকুচিত। ফলে, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন হয়ে উঠে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মাধ্যম। এই আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেমি-ঔপনিবেশিক সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক সরকারকেও হার মানায়। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় ও সুদূরপ্রসারী আত্মদান হল “উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিসর্জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই হতভাগিনী মা, যাকে তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার সন্তান ‘স্বাধীন বাংলাদেশে’র প্রসবকালে জীবনদান করতে হয়েছে।
আবাসিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাভিত্তি ছিল সাম্প্রদায়িক। ফলে এর আবাসিক হলগুলোও ছিল সম্প্রদায়ভিত্তিতে গঠিত। ৪৭-এর দেশভাগের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তানের চরিত্র তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় বিশেষত ছাত্রসমাজকে ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলেছিল। ১৯৭১ সালে তারাই প্রতিষ্ঠিত করেছিল উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। কিন্তু দেশভাগের সাম্প্রদায়িক ভিত্তি এখনো যে ক্রিয়াশীল, তার একটি প্রমাণ বোধহয় এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সম্প্রদায়ভিত্তিক আবাসিকব্যবস্থা।