
২৮২ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
বিষয়: অমর্ত্য সেনের “দ্য আইডিয়া অব জাস্টিস”
বক্তা: আরিফ খান
তারিখ: ২০ অক্টোবর, ২০১৭
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান সৃষ্টি ও বহুমুখী জ্ঞানের সম্মীলন । বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান সৃষ্টির যে ধারণা তার উৎকৃষ্ট রূপায়ন হয়েছে অমর্ত্য সেনের জীবনে ও কর্মে। বহুমুখী জ্ঞানের সফল মিথস্ক্রিয়া দেখা যায় তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলোতে। তিনি অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন। কিন্তু শেষ জীবনে “ল” স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। গত আট দশ বছরে অধিকাংশ লেকচার প্রদান করেছেন আইন বিভাগ ও আইনজীবীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে।
সেমিনাল কাজ হল একজন সাহিত্যিক বা বিজ্ঞানীর পরিচয় সূচক কাজ। সেমিনাল কাজের মাধ্যমে ঐ ব্যক্তিকে চেনা যায় । এই ধরনের কাজ মানুষের খুব ম্যাচিউর বা এ্যাডভান্সড লেভেলে আসে। অমর্ত্য সেনের “দ্য আইডিয়া অব জাস্টিস” একটি সেমিনাল কাজ। কারণ এই বইয়ের মাধ্যমে অমর্ত্য সেনকে বোঝা যায়।
সমাজে ন্যায্যতা সম্পর্কে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আলাদা করে বই কম প্রকাশিত হয়েছে। আধুনিক সময়ে ১৯৭১ সালে আমেরিকান দার্শনিক জন রলসের (১৯২১ - ২০০২) “এ থিউরি অব জাস্টিস” শিরোনামে একটি বই প্রকাশিত হয়। জন রলসের “এ থিউরি অব জাস্টিস” বইয়ের সমালোচনামূলক বই “দ্য আইডিয়া অব জাস্টিস” । “এ থিউরি অব জাস্টিস” বইয়ের অমূল্যায়িত বিষয়, সীমাবদ্ধতা, এড়িয়ে যাওয়া বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করার একটি প্রতিজ্ঞা অমর্ত্য সেনের “দ্য আইডিয়া অব জাস্টিস” বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
অমর্ত্য সেনের মতে জাস্টিসের আদর্শ রূপ কি হতে পারে সে সম্পর্কে আমরা সম্যকভাবে জানি না। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে যে সব অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে, সেগুলোকে আমরা হ্রাস করতে পারি। অন্যায়, অবিচারকে হ্রাস করার মাধ্যমে একটি সৃজনশীল , শান্তিশীল ও গ্রহণযোগ্য সমাজ নির্মাণ করতে পারি। কিভাবে আমরা ভালো থাকতে পারি, এই অনুভূতি আমাদের আছে। প্রতি মুহূর্তে তুলনার মাধ্যমে অধিকতর গ্রহণযোগ্য সমাজ বিনির্মাণে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। তিনি সমাজে ধারাবাহিক বা ধাপে ধাপে ন্যায় বিচার অর্জন করার কথা বলেছেন। আমাদেরকে প্রতিনিয়ত ভালো থাকার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
অন্যদিকে জন রলসের মতে, ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন জরুরি। তিনি মনে করেন, প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মাধ্যমে ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তিনি ন্যায্যতা বলতে সুষম বণ্টন, সমান অধিকার, স্বচ্ছতাকে বুঝিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব হল প্রতিষ্ঠান ও নিয়ম নীতি তৈরি করলে সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
সেনের মতে, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার মধ্যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অমর্ত্য সেনের সাথে জন রলসের মূল পার্থক্য এই বিষয়ে । তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান ও নিয়ম নীতির মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা নেই। কারণ প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ব্যক্তির আচার আচরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ । জাস্টিস বা ন্যায় বিচার সম্পর্কে চূড়ান্ত সংজ্ঞায় পৌঁছানোর আবশক্যতা নেই। জাস্টিস প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ধারাবাহিক ক্রম উন্নতির প্রচেষ্টা করতে হবে।
অমর্ত্য সেনের মতে জাস্টিস প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি মৌলিক উপাদান রয়েছে। প্রথমত, সমাজে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। সমাজের যেকোন সিদ্ধান্ত সমবেতভাবে নিতে হবে- যেমন গণতন্ত্র, ভোটাভুটি, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত সমবেতভাবে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, সমাজে জবাবদিহিতা থাকতে হবে। জনগণের করের টাকায় সরকার বাজেট ঘোষণা করে। বাজেটে ঘোষিত টাকার সঠিক ব্যবহারের তথ্য জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। প্রয়োজনে দুদক ,কোর্ট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য আরো উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, সমাজে ন্যায় বিচারের জন্য পাবলিক ডিসকাশন বজায় রাখতে হবে। সমাজে বাক-স্বাধীনতা অনুপস্থিত হলে সে সমাজে ন্যায়বিচার থাকবে না। চতুর্থত, মানুষের পছন্দকে গণ্ডিবদ্ধ করা যাবে না। তাকে ফ্রিডম অব চয়েস বা পছন্দের স্বাধীনতা দিতে হবে। ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ বিকাশের সুযোগ দিতে হবে।