বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার
জুলাই ২৯, ২০১৭

২৭৪ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

বিষয়: বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার

বক্তা: জুলফিকার ইসলাম

তারিখ: ২৮ জুলাই, ২০১৭

১৯৫৬ সালে মুখ ও মুখোশ সিনেমার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প। আজ এই শিল্পের বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করেছে। স্বাধীনতার পর নতুন প্রতিজ্ঞা ও সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল এই শিল্পের। গুণী নির্মাতা, জুঁতসই গল্প এবং প্রতিভাবান শিল্পীর সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছিল উপভোগ করার মতো, মনে রাখার মতো চলচ্চিত্র। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে চলচ্চিত্র ছিল বরাবরই অস্তিত্ব সংকটে। টেকসই কোনো খাত হিসেবে এই ইন্ডাস্ট্রি এখনো গড়ে উঠতে পারেনি। কারণ ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের সংখ্যা এই ইন্ডাস্ট্রিতে হাতে গোনা।  

এই চলচ্চিত্র শিল্পে ১০ বছর ধরে প্রযোজনা করছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাতে গোনা। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের দর্শকদের নিকট সিনেমাকে পৌঁছে দেয়। দর্শক কেমন চলচ্চিত্র উপভোগ করে, দর্শকের ডেমোগ্রাফী কেমন, দর্শকের বিনোদন প্রবণতা, রুচি, কোন শ্রেণীর দর্শক কেমন চলচ্চিত্র দেখতে ভালোবাসে, কোন ধরণের চলচ্চিত্র সকল শ্রেণীর দর্শককে বিনোদিত করতে পারে , দর্শক কেমন পরিবেশে সিনেমা দেখতে ভালোবাসে, সেগুলো কিভাবে নিশ্চিত করা যাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা  বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আজ গভীর সংকটে। 

বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকে একটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ২০১২ সালে। একটি চলচ্চিত্র একই সাথে একটি আর্টওয়ার্ক এবং বাজারের দিক থেকে একটি পণ্য বা সেবা। দর্শক এর গুণগত মান বিচার করেই পণ্য বা সেবাটি ক্রয় করেন।  সিনেমা তৈরির কাজটি পরিচালকের নেতৃত্বে হয়ে থাকে। এর সাথে জড়িত থাকেন অভিনয়শিল্পী, সিনেমাটোগ্রাফার, শব্দ প্রোকৌশলী, ভিডিও এডিটর, কোরিওগ্রাফার, সঙ্গীত আয়োজকসহ আরও অনেক কলাকুশলী। এগুলোর প্রতিটিই বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে এ দেশে বেশ ক’জন গুণী নির্মাতা জন্মেছেন। তারা সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় এই দক্ষতা এবং জ্ঞান অর্জন করেছেন।  কিন্তু টেকসই ইন্ডাস্ট্রি গড়তে হলে এই জ্ঞান ও দক্ষতার প্রশিক্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকতে হয় যা ২০১২ সালের পূর্বে বাংলাদেশে ছিল না। 

২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র খাতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৬৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বলিউডের একটি গড়পড়তা ছবিতেই এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ হয়। ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘বাজিরাও মাস্তানি’তেই বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা । আর ৬০ বছর বয়সী ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রিতে ১০ কোটি টাকার উপর আয় করেছে মাত্র ৩ টি সিনেমা।   

সিনেমার প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রেও এফডিসি-কেন্দ্রিক মূলধারার সিনেমাগুলোর প্রথাবদ্ধতা দেখা যায়। প্রচারের মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় রঙ্গিন পোস্টার। কোনো ইনোভেশন থাকে না সেই পোস্টারে, ৩০ বছরের পুরনো স্টাইল এখনো অনুসরণ করা হয়। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আয়নাবাজি’র ৩৬০ ডিগ্রি কমিউনিকেশন বাংলা চলচ্চিত্রের বিপণনে একটি আদর্শ হিসেবে থেকে যাবে। এছাড়া ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাজ মাল্টিমিডিয়ার বিপণন কৌশলেও নতুনত্ব পরিলক্ষিত হয়। 

সবশেষে বলা যায়, বাংলা চলচ্চিত্রের সংকটের পেছনে রয়েছে চলচ্চিত্রের বাজার বা দর্শকদের প্রতি সংবেদনহীনতা, চলচ্চিত্র বিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতার প্রসারে প্রতিষ্ঠানের অভাব, সুষ্ঠু সাপ্লাই চেইনের অভাব, পেশাগত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভাব এবং সর্বোপরি সরকারের নীতি দুর্বলতা। বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য এ বিষয়গুলোর প্রতিটিতেই প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিতে হবে এবং উদ্যোগ নিতে হবে।

cross-circle