তপন রায়চৌধুরী (১৯২৬-২০১৪): এক অন্যরকম বাঙাল
এপ্রিল ২৪, ২০১৭

২৬৩ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার

বিষয়: তপন রায়চৌধুরী (১৯২৬-২০১৪): এক অন্যরকম বাঙাল

বক্তা: আতাউর রহমান মারুফ

তারিখ: ০৮ এপ্রিল, ২০১৭

তপন রায়চৌধুরী একজন বিচিত্রগামী ব্যতিক্রমী ইতিহাসবিদ। ব্রিটিশ ভারতে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক নতুন ও ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যা তৈরী করেছেন তিনি। তিনি ব্যক্তির মানস ব্যাখ্যার মাধ্যমে সামাজিক ইতিহাস তৈরির প্রচেষ্টা করেছেন। বাঙালি ইতিহাসবিদদের মধ্যে যা বিরল দৃষ্টান্ত। নিহাররঞ্জন রায় প্রমুখের মাধ্যমে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের নতুন ধারা শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয় কোনো কোনা সূত্রে। তপন রায়চৌধুরী তা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। কেবল সামাজিক ইতিহাস নয়, সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং মননশীলতার ইতিহাস রচনারও পথ দেখিয়ে গেছেন।” 

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তপন রায়ের পরিবারকে পশ্চিমবঙ্গে স্থানান্তরিত হতে হয়। তবুও পূর্ববাংলার স্মৃতি তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। তিনি সেই স্মৃতিকে ধারণ করেছেন, ভালবেসেছেন এবং সারাজীবন এই স্মৃতিকে বহন করেছেন। নিরস ইতিহাসে তিনি সঞ্চার করেছেন  ব্যতিক্রমী সাহিত্যরস। তার এই প্রচেষ্টা প্রশংসিত হয়েছিল।

দেশভাগের পর তপন রায়ের পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। তবুও শুধুমাত্র গবেষণার লক্ষ্যের প্রতি অগাধ ভালবাসার কারণেই তিনি তৎকালে সবচেয়ে চাহিদাবহুল চাকরি আইসিএসের মায়া ছেড়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন এবং গবেষণা শুরু করেন। মুগল শাসনামাল বিষয়ে গবেষণার জন্য তিনি ফার্সি ভাষা শেখেন। গবেষণা করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য পুরনো পুঁথি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য তিনি বিভিন্ন ভাষা শিখেন। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি ডাচ ভাষা শিখেছেন, শুধুমাত্র ভারতে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম গবেষণার জন্য। গবেষণার প্রতি এই আগ্রহই তাকে একজন জগদ্বিখ্যাত ইতিহাসিবিদে পরিণত করে। 

তপন রায়চৌধুরী মোট আটটি গ্রন্থের রচিয়তা। এর মধ্যে চারটি তার মৌলিক গবেষণা, একটি সম্পাদনা এবং তিনি তিনটি আত্মজীবনী রচনা করেছিলেন। তপন রায়চৌধুরীর গ্রন্থগুলোকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমদিকে তার লেখায় মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে। তপন রায় মুগল শাসনামলের ফলে বাংলার অর্থনীতিতে কি প্রভাব পড়েছে তার উপর গবেষণা করেছেন। এই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি সেসময়ের সমাজব্যবস্থার নৃতাত্ত্বিক ব্যখ্যাসহ ৪০ পৃষ্ঠার নতুন একটি ভূমিকা লেখেন, যা সর্বব্যাপী প্রশংসিত হয়। তার অক্সফোর্ডের থিসিসের বিষয় ছিল তামিলনাড়ুতে ডাচ বাণিজ্য নিয়ে। 

১৯৮৮ সালে তার বিখ্যাত বই ‘ইউরোপ পুনর্দর্শন’ বইটি প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তিনজন বাঙালীর মনো-সামাজিক অবস্থা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইউরোপ সম্বন্ধে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির প্রচেষ্টা করেন। উনিশ শতকে বাংলায় শুরু হওয়া বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারকে ইউরোপীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব ও ফসল বলে মনে করা হয়। তপন রায়চৌধুরী তার গবেষণার জন্য সেসময়ের তিনজন বিখ্যাত ব্যক্তি ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং স্বামী বিবেকানন্দকে নির্ধারণ করেন। তপন রায় এদের মানসিক ভূগোল ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে উনিশ শতকের বাংলায় ইউরোপীয় শিক্ষা সংস্কৃতির প্রভাবকে পুনর্বিবেচনা করেন। মূলত আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভূত এক ধরণের জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিতেই উনিশ শতকের বাংলায় বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারের উদ্যম দেখা গিয়েছিল।     

১৯৯৩ সালে তিনি প্রথম বাংলায় ‘রোমন্থন’ নামক স্মৃতিকথা বইটি লেখেন। এর পর তিনি তার বিখ্যাত ‘বাঙালনামা’ বইটি লেখেন। এই বইটি শুধু তার স্মৃতিকথাই নয়, বরং তার সময়ের এক ঐতিহাসিক আকর গ্রন্থও বটে। পূর্ববঙ্গ, বরিশালের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অমর্ত্য সেন, নীরদ চন্দ্র চৌধুরীসহ বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিসহ বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আলোচিত হয়েছে বইটিতে। এই বইটি বিপুল জনপ্রিয় হয়। গবেষণার প্রতি সারাজীবনভর তার এই নিরলস সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ভারতের পদ্মভূষণসহ দেশে বিদেশে বিভিন্নভাবে সম্মানিত ও পুরষ্কৃত হয়েছিলেন।

cross-circle