
২৫৪ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার
বিষয়: বাংলাদেশে ভূমি মালিকানার রাজনৈতিক অর্থনীতি
বক্তা: জুলফিকার ইসলাম
তারিখ: ১৪ জানুয়ারি ২০১৭
৫৭ হাজার বর্গমাইল আয়তনের নদীমাতৃক, জলবেষ্টিত ও ঘনবসতিপূর্ণ এই বাংলাদেশ । নদী ও জলাভূমির বাইরে যে ভূমিখণ্ড রয়েছে সেখানেই বসবাস এবং জীবিকা উপার্জনে কাজে লাগায় ১৬ কোটি মানুষ। বাংলাদেশের সংবিধানে যে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য নাগরিকরা সকলেই অধিকার অনুযায়ী ন্যায্য ভূমিটুকু পাচ্ছে কিনা এই প্রশ্ন করা জরুরি। পুঁজিবাদী শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার অভিঘাত ভূমির মালিকানায় কিভাবে পড়েছে, তা জরিপ করাও জরুরি।
১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ এর কারণে জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হয়। এটি একটি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রায় এক শতক ব্যাপী জমির উপর ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের পর ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন-১৮৮৫’ পাশ হয়। কিন্তু এই আইন কৃষকদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। পরে ১৯৫১ সালে গৃহীত হলো “পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন (EBSATA-১৯৫১)- যেখানে আইনের দৃষ্টিতে কৃষককে তার ন্যায্য অধিকার দেওয়া হয়েছিল। আইনে স্পষ্ট বলা ছিল, রাষ্ট্র ও কৃষকের মধ্যে অন্তর্বর্তী কোনো সত্তা থাকবে না। কিন্তু এই আইন কখনো বাস্তবায়িত হয় নি। জমিদারি ও জোতদারি প্রথা বিলোপ হয়েছিল মাত্র।
বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরাক্রমশালী হয়ে উঠছে, তখন ভূমি মালিকানার প্রশ্নটি গুরুত্ব হারায়। তখন বলা হতে থাকে কৃষি নয় বরং বাণিজ্যে মনোযোগ দাও। অনুন্নত দেশগুলোকে নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শন মেনে নিতে বাধ্য করলো। অর্থাৎ ‘সবকিছু ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দাও’ , ‘সবকিছু উদারীকরণ ও মুক্তকরণ করো’। আর ভূমি সংস্কার নিয়ে সরকার থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে অনীহা দেখা দিল। তাছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, অনেকেই মনে করা শুরু করলেন যে ভূমি সংস্কার করলে বর্তমান সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে এবং অনিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। এর ফলে গত চার দশকে আমরা আবার সেই দ্বৈত অর্থনীতিতে ফিরে গেছি। একটি অর্থনীতিতে ১০ লাখ মানুষ যারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে শোষণ করছে, অপর অর্থনীতিতে ১৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ শোষিত হচ্ছে এবং ক্রমাগত প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬০ সালে ভূমিহীনের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ আর ২০০৮ সালে ভূমিহীনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ শতাংশ । খাস জমির ৮৮ শতাংশ ধনী ও প্রভাবশালীর দখলে। খাস জমির উপর অধিকার টিকিয়ে রাখতে পেরেছে মাত্র ৪৬ শতাংশ সুফলভোগী। এদেশের ৫ শতাংশ মানুষ (৭০-৭৫ লক্ষ) চরে বাস করে যাদের ৮০ শতাংশ দরিদ্র। নদীভাঙ্গন, ভূমিহীনতা এবং কাজের খোঁজে মানুষ চরে বাস করে। চরের ৭৭ ভাগ মানুষের দখলে আছে ৪৭ ভাগ জমি আর ১ ভাগ মানুষের হাতে আছে ১৫ ভাগ জমি।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি শত্রু সম্পত্তি আইনের মারপ্যাচে ১২ লক্ষ হিন্দু খানার ৫০ লক্ষ (মোট হিন্দু খানার ৪০ শতাংশ) মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই আইনে ভূমি চ্যুতির পরিমাণ ২৬ লক্ষ একর যা হিন্দু সম্প্রদায়ের মোট ভূমি মালিকানার ৫৩ শতাংশ।
সরকারি হিসেবে এদেশের জনসংখ্যার ১.২ শতাংশ মানুষ ৪৯টি বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত। রাঙামাটি জেলার পাহাড়গুলোর আওতায় থাকা প্রায় ৪০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করেছে সরকারের বনবিভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৬৭ শতাংশ খানা ভূমিহীন । সমতলের আদিবাসীদের ৬৯ শতাংশ খানা কার্যত ভূমিহীন । সমতলের ১০ টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী গত ত্রিশ বছরে মোট ভূমি হারিয়েছেন ৬ লক্ষ ৭ হাজার বিঘা। এসব ভূমির ৯০ শতাংশই দখল করেছেন সেটেলার বাঙালিরা।