ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় ক্ষমতা ও দ্বন্দ্বের ২৪৩ বছর, ইতিহাসের ক্লাইম্যাক্স
অক্টোবর ১০, ২০২১

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় আমাদেরকে আমাদের সামনে গত ৪০০ বছর ধরে অমীমাংসিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজৈনতিক তর্ক নতুনভাবে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। এই তর্কের শুরু বিচার বিভাগের ক্ষমতার পরিধি বা স্বাধীনতা বিষয়ে নয় বরং শুরুটা হয়েছিল খোদ সংসদের ক্ষমতা, পরিধি ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গে।

মানব ইতিহাসের রাজৈনতিক বিবর্তনের ক্রমধারায় ১৬৮৮ সাল তাই একটি মাইলফলক। কেননা, এই বছর আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার অন্যতম একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদের সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু যুদ্ধটি সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। সংসদ দেখল এর পরও রাজার হাতে যে বিপুল ক্ষমতা রয়ে গেছে তা দিয়ে সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাজা অনেক কিছুই করতে পারেন। বিশেষ করে বিচার বিভাগের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে রাজার অধীনস্ত হওয়ার কারণে রাজা ছিল স্বেচ্ছাচার ও সকল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ফলে এ পর্যায়ে প্রশ্ন উঠল বিচার বিভাগের ক্ষমতা কার হাতে থাকা উচিত এবং সুদীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ১৭০১ সালে প্রণীত হয় আরেকটি আইন যার নাম অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্ট।

এই আইনেরও মূল বিষয়বস্তু বিচার বিভাগ ছিল না। বরং এই আইনের মূল তর্ক ছিল ইংল্যান্ডের রাজা বা রানি রোমান ক্যাথলিক না প্রোটেস্টেন্ট খ্রিষ্টান অনুসারীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবে সেই বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ফয়সালা করা। এ কাজ করতে গিয়ে পার্লামেন্ট স্বভাবতই তৎকালীন রাজার উপর বেশ প্রভাব বা জোর খাটানোর মতো অবস্থানে ছিল। এ প্রভাবের জোরে পার্লামেন্ট এই আইনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছিল। আর সেটি হলো ‘জাজেজ কমিশন বি মেইড কোয়াম ডি সে ব্যানে জেশেরিন্ট’ ও তাদের বেতন-ভাতা। মজার বিষয় হলো ১৭০১ সালের আইনটির নামের মধ্যেই আইনটির উদ্দেশ্য সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। আইনটির পূর্ণাঙ্গ নাম হলো : An Act for the Further Limitation of the Crown and Better Securing the Rights and Liberties of the Subject. উপরের এই নামে লক্ষ করুন যে, বলা হচ্ছে রাজার ক্ষমতার অধিকতর সীমা আরোপের উদ্দেশ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হলো।

ইতিহাসের এই পশ্চাৎপট থেকেই আমাদেরকে বিচার বিভাগের ক্ষমতার বর্তমান বিতর্কের ন্যায্যতা নিরূপণ করতে হবে। এই বিতর্কে আবশ্যিক অংশ হিসেবে আমরা যদি ইতিহাসকে সঙ্গে না রাখি তাহলে আমাদের সিদ্ধান্ত অবধারিতভাবে ভুল হবে। আমাদেরকে প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে, মানব সভ্যতার রাজৈনতিক বিবর্তনের ইতিহাস ২০১৭ সালে এসে থেমে যায়নি বরং নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে আরো কার্যকর, আরো টেকসই রাজৈনতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ বাকি রয়ে গেছে। যে রাজার একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরার জন্য পার্লামেন্টের সৃষ্টি, সেই পার্লামেন্টই যদি আজ অন্য নামে সেই রাজার মতোই একক ও নিরঙ্কুশ রাষ্ট্র ক্ষমতা চর্চার দাবি নিয়ে বসে থাকে তাহলে বুঝতে হবে আমরা ইতিহাসকে এর সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাঠ করিনি। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা রাজার হাত থেকে সংসদের হাতে এসেছিল রাজৈনতিক ইতিহাসের একটি অনিবার্য বিবর্তনের ধাপ বা স্তর হিসেবে। আমরা যদি আজ সিদ্ধান্ত নিই যে, আমাদের রাজৈনতিক ইতিহাসের বিবর্তনের সব ধাপ বা সব স্তর আমরা ইতিমধ্যে পার হয়ে এসেছি তা হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বরং নিত্য-নতুন সৃজনশীল, রাজৈনতিক ব্যবস্থা প্রণয়ন ও চর্চার বহু কাজ আমাদের বাকি রয়ে গেছে।

১৭০১ সালে অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্ট-এর মধ্য দিয়ে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে গিয়েছে এবং সেই বীজ ১৭৭৪ সালে ভারতের মাটিতে অঙ্কুরিত হয়েছে, তবে একটু ভিন্নভাবে। ১৭৭৪ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্টকে বলা হয় ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সাংবিধানিক আইন। এ আইনের মাধ্যমেই এ উপমহাদেশে প্রথম সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ আইনে বিধান করা হয় যে, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয় তাহলে এর বিচার করবে লন্ডনে অবস্থিত কিংস বেঞ্চ। অভিযোগের তদন্ত করবেন গভর্নর জেনারেলসহ তার কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ।

এ হাইকোর্টসমূহের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিচার ও তাদের অপসারণের ক্ষমতা প্রদান করা হয় সংসদকে, তবে হাউস অব কমন্স-কে নয়, বরং প্রিভি কাউন্সিলের হাতে। ১৮৬২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ সময় বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা প্রিভি কাউন্সিলের হাতেই ন্যাস্ত ছিল এবং লক্ষণীয় বিষয় হলো ইংল্যান্ডের সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রিভি কাউন্সিল একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, একে ঠিক আমাদের সংসদের সঙ্গে তুলনা করা চলে না। কেননা, প্রিভি কাউন্সিলের সদস্যগণ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপি নন। তারা সামাজিক, রাজৈনতিক, অর্থৈনতিক, শিক্ষা, সামরিক বাহিনী, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব এবং সরকার তাদের সুদীর্ঘ সময়ের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহারের জন্য তাদেরকে প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করেন।

১৯৪৯ সালে ভারত তার সংবিধান প্রণয়ন করেন। সেখানে তারা বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে রেখেছে, তবে ভুলে গেলে চলবে না যে ভারতের সংসদ ইংল্যান্ডের মতোই দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট এবং সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান তার প্রথম সংবিধান প্রণয়ন করেন। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে রাখা হয় বটে, তবে দুই বছর না যেতেই ১৯৫৮ সালে সামরিক ক্সস্বরাচার আইয়ুব খান এই সংবিধান বাতিল ঘোষণা করেন। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান নিজেই জাতিকে একটি সংবিধান প্রদান করেন। এই সংবিধানে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল নামে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের হাতে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। এ সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে রাখা হয়। কিন্তু পার্থক্যটি খেয়াল রাখতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের সংসদ ইংল্যান্ড বা ভারতের সংসদের মতো দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট ছিল না। তবে বাহাত্তরের সংবিধান অনুযায়ী সংসদের হাতে বিচারপতি অপসারণের এই ক্ষমতা মাত্র দুই বছর ছিল। ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী দ্বারা সংসদের হাত থেকে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা একক ও নিরঙ্কুশভাবে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যাস্ত করা হয়। ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কর্তৃক বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নিয়ে আবার সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল-এর হাতে অর্পণ করা হয়।

২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনী পাস হওয়ার আগ পর্যন্ত বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের হাতেই অর্পিত ছিল। ফলে, ১৭৭৪ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছরের ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিবর্তনের ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যায় উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সবসময়ই কোনোনা-কোনো আঙ্গিকে কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের উপর ন্যাস্ত ছিল। আরো হিসেবে বললে এই প্রায় আড়াইশ বছরের ইতিহাসে সাকুল্যে মাত্র ৫ বছর বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ছিল (১৯৫৬-৫৮ ও ১৯৭৩-৭৪)।

cross-circle