
বাংলা সাহিত্যে মননশীল লেখকদের ধারাটি সংক্ষিপ্ত এবং সীমিত। সাহিত্যের এই বিরল ধারারই একজন প্রতিনিধি মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬)। তিনি লিখেছেন অত্যন্ত অল্প; কিন্তু তার চিন্তার বহর অভাবনীয়ভাবে বিশাল। মানুষকে কীভাবে প্রাণিত্ব থেকে মনুষ্যত্বে উত্তীর্ণ করা যায়, সভ্য ও সংষ্কতিমান করা যায়- এই ছিল তাঁর সারাজীবনের সাধনা। ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও এনলাইটেনমেন্ট থেকে উদ্ভূত উদারনেতিক আদর্শের নির্ভেজাল সাধক ছিলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী। বঙ্গীয় রেনেসাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথের মানবিক চিন্তা-দর্শন ও প্রমথ চেীধুরীর সুললিত গদ্যভঙ্গির সমন্বয়ের মাধ্যমে তিনি তার জীবনদৃষ্টি ও সাহিত্যশৈলী অর্জন করেছিলেন। আদতে তিনি ছিলেন কবিপ্রাণ, প্রথম বয়সে কবিতা-ই লিখতেন। কিন্তু মননশীল রচনাতেই তিনি স্থিতধী হয়েছিলেন, মনোনিবেশ করেছেন সভ্যতা ও সংষ্কতির সাধনায়। তার রচনাগুলো খেয়াল করলে আমরা দেখব যে, তিনি মানুষের কতিপয় মে․লিক বিষয়াবলি নিয়ে ধ্যান করেছেন। তিনি চেয়েছেন কীভাবে একজন মানুষের জীবনকে সুন্দর ও বিকশিত করা যায়। বঙ্গদেশে রবীন্দ্রনাথের পরে মানুষের জীবনের সে․ন্দর্য নিয়ে এভাবে গুরুত্ব দিয়ে কেউ ভাবেননি। তার রচনার পুরোটাই একটি বিষয়-কেন্দ্রিক। বলা যায়, তিনি একটি ডিসকোর্স নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তার এই ডিসকোর্সটি হলো ‘কিভাবে মানবজীবন সুন্দর করা যায়’ অর্থাৎ তিনি মানুষকে সংষ্কতিবান হতে প্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি আমাদের সমাজে একজন দুর্লভ দার্শনিক। তাকে আমরা দার্শনিক বলব একারণে যে, তিনি মানুষের মে․লিক বিষয় নিয়ে ভেবেছেন এবং একটি বিশেষ ডিসকোর্সের নির্মাণ করেছেন। তার এই ডিসকোর্সটি হলো ‘সংষ্কতির সাধনা’। ব্যক্তি জীবনে আমরা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। ব্যক্তির সমন্বয়েই রাষ্ট্র। ব্যক্তি জীবনে রয়েছে ব্যথা, বেদনা, সফলতাব্যর্থতা, জয়-পরাজয়, সুখ-শান্তি, অসুস্থতা-সুস্থতা ইত্যাদি। মোতাহের হোসেন চৌধুরী জীবনের এসব মে․লিকবিষয় নিয়ে সুদীর্ঘ সময় তন্নিষ্ট হয়ে ভেবেছেন এবং তার চিন্তাগুলো আমাদের কাছে উন্মোচন করেছেন।
এসব চিন্তায় তার অভাবনীয় শাণিত প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। এধরণের চিন্তা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে অত্যন্ত দুর্লভ। এদিক থেকে তাকে আমরা কান্ট, হিউম, রাসেল প্রমুখ চিন্তকদের কাতারে বিবেচনা করতে বাধ্য হই। তার এসব চিন্তার মধ্যে রয়েছে এক অসাধারণ ভারসাম্য। তিনি জীবন ও জগতের মধ্যে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কের চিত্র আমাদের মাঝে উপস্থাপন করেছেন। জগতের কোনো কিছুই তার কাছে অনর্থক নয়। আবার সবকিছুই বিবেচনাহীনভাবে তিনি গ্রহণ করতেও নারাজ। তার এসব চিন্তায় রয়েছে অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা। ব্যক্তি জীবন সুন্দর করার ক্ষেত্রে তার এসব চিন্তা অত্যন্ত কার্যকর দিকনির্দেশনা। আর ব্যক্তি জীবন সুন্দর মানে রাষ্ট্রের সে․ন্দর্য সুনিশ্চিত করা। মোতাহের হোসেন চৌধুরী ১৯০৩ সালে নোয়াখালীর কাঞ্চনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবদুল মজিদ পেশায় একজন সাব-রেজিস্ট্রার ছিলেন। মাতা ফাতেমা খাতুন কুমিল্লার বিখ্যাত একটি দারোগা বাড়ির কন্যা ছিলেন। মোতাহের হোসেন চৌধুরী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ১৯৪০-৪১ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের লেকচারার নিযুক্ত হন। এসময় তিনি বেকার হোস্টেলের (ইসলামিয়া কলেজের একটি হোস্টেল) তত্ত¡াবধায়কের দায়িত্ব পালন করেন। দেশভাগের পর তিনি চট্রগ্রাম কলেজে বদলি হন। মোতাহের হোসেন চৌধুরী স্নাতক পাশ করে ইউসুফ উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানেই তার সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। এসময় ঢাকার সাহিত্য সমাজের সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘটে এবং উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ লাভ করেন। প্রথম জীবনে তিনি কবিতা লিখতেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সভ্য কাজী আবদুল ওদুদ উল্লেখ করেছেন যে, সতেরো-আঠারো বছর বয়সে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কবিতা মাসিকপত্রে ছদ্মনামে প্রকাশিত হতো। ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো ‘ মোহোচৌ’। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে মুসলিম সাহিত্যসমাজের সান্নিধ্যে এসে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর বিশেষ বাকবদল ঘটে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, বার্টান্ড রাসেল, ক্লাইভ বেল প্রমুখ চিন্তক দ্বারা তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
তার জীবৎকালে কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিনটি। তারমধ্যে একটি প্রবন্ধ সংকলন ও দুটি অনুবাদগ্রন্থ। মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমি ১৯৭০ সালে তার বিখ্যাত সংস্কৃতি কথা গ্রন্থটি প্রকাশ করে। সুখ শিরোনামে ক ¬াইভ বেল (১৮৮১-১৯৬৪)-এর ঈরারষরুধঃরড়হ গ্রন্থের অনুবাদ করেন। এটি বাংলা একাডেমি ১৯৬৫ সালে প্রকাশ করে। তিনি বার্টান্ড রাসেলের ঞযব ঈড়হয়ঁবংঃ ড়ভ ঐধঢ়ঢ়রহবংং (১৯৩০) বইয়ের অনুবাদ করেছিলেন, যা ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে সভ্যতা শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৮ সালে বাংলা একাডেমি থেকে মোতাহের হোসেন চৌধুরী শীর্ষক তার জীবনী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখিত গ্রন্থটি ২০১৩ সালে শুদ্ধস্বর পুনমুর্দ্রণ করেছে। গবেষক ক্সসয়দ আবুল মকসুদের সম্পাদনায় এক খণ্ডে মোতাহের হোসেন চৌধুরী রচনাবলি প্রকাশিত হয়, যা ২০১৩ সালে নবযুগ প্রকাশনী পুনমুর্দ্রণ করেছে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁকে নিয়ে লিখিত রচনার সংকলন সংস্কৃতি-সাধক মোতাহের হোসেন চৌধুরী।